Logo

কৃষি বাজেট ভাবনা অথবা বাজেটে কৃষি উন্নয়ন ভাবনা

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৯ জুন, ২০২৬, ১৮:৫২
কৃষি বাজেট ভাবনা অথবা বাজেটে কৃষি উন্নয়ন ভাবনা
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, উন্নতির ধারাটা ধীর গতি হলেও আগাচ্ছে। দেশের সেক্টর ভিত্তিক উন্নয়ন ধারাকে যদি প‌্যারামিটারে মাপা হয় তবে দেখা যাবে কিছু ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সেক্টর ওয়ারি দৃশ‌্যমান উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে গামেন্টস, কৃষি এবং রেমিট‌্যান্স এর উন্নয়নটি চোখে পড়েছে। বিশেষ করে কৃষির উন্নয়ন দৃশ‌্যমান এবং সর্বজন প্রশংসনীয়। একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই ছিল গ্রাম কেন্দ্রীক। গ্রামকে নিয়েই ছিল দেশের উন্নয়ন ভাবনা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের মূলভিত্তি হলো কৃষি এবং কৃষি পণ‌্য উৎপাদনকারী। গত বিশ বছরের কৃষি অর্থনীতির ক্রম ধারায় আসছে বেশ কিছু পরিবর্তন। বাজেটে কৃষি অংশের শতকরা হার কমেছে, জিডিপিতে কৃষির অংশ কমেছে এবং একই সাথে কৃষিতে নিয়োজিত মানুষের সংখ‌্যাও কমেছে। কিন্তু বেড়েছে কৃষির উৎপাদন। জনসংখ‌্যা বৃদ্ধি, ফসলী জমি কমার পরও উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে খাদ‌্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে। কৃষি খাতে অর্থনীতিক প‌্যারামিটার কমার মাঝেও কৃষির উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। মূল লেখায় যাওয়ার আগে কিছু পরিসংখ‌্যান দেখে নেয়া যাক।

গত বিশ বছরের কৃষি বাজেট বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৮ হতে ২০২২ পর্যন্ত কৃষি সেক্টরে বাজেট বরাদ্দের হার ছিল সর্বনিম্ন, ওই সময় কৃষিতে মোট বাজেটের মাত্র ২.৭ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়। অথচ স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭৭-৭৮ সালে মোট বাজেট ছিল ২১৭৬ কোটি টাকা, আর কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে মোট বাজেটের প্রায় ২৬% ব‌্যয় করা হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকারের মূল উন্নয়ন ভাবনা ছিল গ্রাম কেন্দ্রীয়। তারমানে বর্তমান সরকারী দল জন্ম থেকেই কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে ফোকাস করেছে। কৃষিতে বরাদ্দ কমার কারণ হিসেবে শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ‌্য, বিদুৎ ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি।

বিজ্ঞাপন

২০০৬-০৭ সালে দেশের বাজেট ছিল ৬৯, ৭৪০ কোটি টাকা, যার মধ‌্যে কৃষিতে বরাদ্দ ছিল ৬০০০ কোটি টাকা (৮.৬%) এবং ৫২-৫৪% জনসংখ‌্যা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত ছিল, জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৯.১। অথচ ২০ বছরে এটি কমে হয়েছে প্রায় অর্ধেক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ৭৯৭০০০ কোটি টাকা যার বিপরীতে কৃষি বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৮২৫৯ কোটি টাকা (৪.৮%) এবং কৃষি সেক্টরে ৪৪.২৬% জনসংখ‌্যা সম্পৃক্ত এবং জিডিপি হার ১১.১৬।

স্বাধীনতা উত্তর দেশের জনসংখ‌্যা ছিল ৭ কোটি এবং ৯১.৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে খাদ‌্য উৎপাদন (ধান ও গম) ছিল ১.১ কোটি মে.টন। বর্তমানে দেশের জনসংখ‌্যা প্রায় ১৮ কোটি এবং ৭৮.৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে খাদ‌্য উৎপাদন (ধান ও গম) ৪.২৭ কোটি মে. টন। অর্থাৎ দেশের জনসংখ‌্যা আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেলেও জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং খাদ‌্য উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণেরও বেশি। কৃষিতে প্রতিনিয়ত নানাবিধ চ‌্যালেঞ্জ বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, ঝড় জলোচ্ছাস, প্রতিকূল প্রতিবেশসহ নানাবিধ সমস‌্যা। এসকল সমস‌্যা সমাধান করে কৃষি উন্নয়নের ধারা অব‌্যাহত আছে। এটিকে ধরে রাখাই এই সরকারের বড় চ‌্যালেঞ্জ বলে আমার ধারণা। এটি সত‌্যি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রয়োগিক দিকগুলো নিয়ে কাজ করা জরুরী।

ইশতেহারে ফসল উৎপাদনকারীর সুরক্ষার জন্য কৃষক র্কাড, ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষি বীমার কথা বলা হয়েছে। এতে করে ফসল উৎপাদনকারী কৃষিতে বিনিয়োগে আগ্রহ সৃষ্টি হবে। পূর্বে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে তারা সবসময়ে শঙ্কায় থাকতো। তদুপরি হঠাৎ বন্যা, জলোচ্ছাস, বাধভাঙ্গা এবং প্রতিকূল জলবায়ুজনিত কারণে ফসল রক্ষায় উপকূলীয় এলাকাসহ পাহাড়ী সীমানা ঘেষার কৃষকরা সবসময়ে চিন্তামগ্ন থাকেন। বিশেষ করে ধান সংগ্রহের মৌসুমে হাকালুকি হাওর এলাকায় হঠাৎ বন্যার কারণে কৃষকরা ঝুঁকির শঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে এবছর ফ্লাশ ফ্লাডের কারণে হাওড় এলাকায় কৃষকের কান্না অনেক-কেই কাদিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

খাদ‌্য নিরাপত্তার বিষয়টির সাথে সাথে সরকারকে সামজিক নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কৃষকরা অনেক সময় স্বল্প মেয়াদি কৃষি লোন নিয়ে ফসল ফলানোর পর প্রতিকূল পরিবেশ এবং জলবায়ুর ঝুকির কারণে ফসল ঘরে তোলার সম্ভব হয় না। কৃষি বীমা চালু হলে কৃষকদের এসকল ক্ষতি পুসিড়ে নেয়ার সযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এরই ধারাবাহিক ভাবনা হিসেবে শস‌্যবীমার যৌক্তিক দাবিও সামনে আসছে। শস‌্যবীমাটি সরকারের নির্বচিনী ইশতেহারের ছিল, সরকার ইতোমধ‌্যে এটি বাস্তবায়নে উদ‌্যোগ গ্রহণ করেছে। শস‌্যবীমা নীতি তৈরির কাজ শুরু করেছে। আশার কথা হলো শস‌্যবীমার নীতিমালা তৈরি হচ্ছে আবার কেউ কেউ হতাশায় আছে যদি এটি বাস্তবায়ন না হয়। দৃশ‌্যমান অগ্রগতি মানুষ তখনই দেখবে যখন বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি হ্রাস এবং কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরেণের লক্ষ্যে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্যবীমা চালুর চিন্তা করছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষায় কাজ করবে। শস্য বীমার চালুর কিছু ঝুঁকি রয়েছে এসকল ঝুঁকি বিবেচনা রেখের দেশের স্বার্থে সরকারের এ পদক্ষেপটি অনেকেই সাদুবাদ জানাবে।

কৃষি বাজেটের একটা বড় অংশ ব‌্যয় হয় সার ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্র, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, বীজ উন্নয়ন, গবেষণা, প্রণোদনা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সহায়তা, কৃষিঋণ সহায়তা এবং জলবায়ু সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি উন্নয়ন।

বিজ্ঞাপন

কৃষি উন্নয়নকে কেন্দ্র করে নির্বাচন ইশতেহারে অন্তত ১২টি পয়েন্টে পুরো কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক ও বাণিজ্যিকিকরণের বিষয়টি সবিস্তরে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষিত তরুণরা কৃষি ভিত্তিক বাণিজ্যে আগ্রহী হচ্ছে, অনেকে প্রবাস জীবন ছেড়ে কৃষি ব্যবসা করছে। কৃষি ব্যবসার ধরণও পরিবর্তন হয়েছে। একসময় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এরকম পণ্য মৌসুমে কম দামে কিনে মজুদ করে অমৌসুমে বিক্রয় করাটাই ছিল মূল কৃষি ব্যবসা। এখন এটি পরিবর্তন হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে যে কোন কাজই আর্থিক লাভ ক্ষতি বিবেচনায় আনা হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ ক্ষতির হিসাবটি আরো বেশি নিবিড়ভাবে করা হয়। এতোদিন আমাদের কৃষি ছিল খোরপোষ, কোন রকম খেয়ে পড়ে চলতে পারলেই কৃষকরা খুশি থাকতো। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পারিবারিক চাহিদা মেটানো। এই ভাবনা থেকে কৃষকরা বের হয়ে আসছে। তারাও কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে নিতে চাচ্ছেন, লাভ ক্ষতির হিসাব করছে। শিক্ষিত যুবারা কৃষিতে বিনিয়োগ করছে। তারা কৃষি বিনিয়োগের লাভজনক দিকগুলো বিবেচনায় আনছে।

সরকারের পরিকল্পনায় এগ্রোপ্রেনারশীপ স্টার্টআপ প্রকল্প গ্রহণ এবং উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টি যেমন রয়েছে তেমনী ৪র্থ শিল্প বিপ্লব যুগে টেকসই কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে তরণ শিক্ষিত যুবকরা কৃষি উদ্যোক্তা হবার পথ তৈরি হলো। মাঠে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, স্বল্প খরচে মানসম্মত কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিযোগি বাজারমূল্যে গ্রাহক কৃষি পণ্য গ্রহণ করার পথ তৈরি হবে। উদ্যোক্তরা তাদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে নতুন নতুর কৃষি ব্যবসা প্রসার ঘটাবে।

বিজ্ঞাপন

দেশি এবং আন্তজার্তিক বাজারের চাহিদা সমন্বয় করে কৃষি ব্যবসাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কৃষিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবসার পাশাপাশি কৃষি ভিত্তিক শিল্প প্রসার হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাণিজ্যিক কৃষির পাশাপাশি জলবায়ুসহণশীল কৃষির বিষয়টি সরকারের নজর এবং পরিকল্পনায় রয়েছে। জলবায়ু অভিযোজনের এবং জলবায়ুর প্রতিকূল মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

মোটাদাগে খোরপোষ কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর, কৃষক সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার জন্য যুগোপযুগি কৃষি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। প্রাধান‌্য দিতে হবে যান্ত্রিক নির্ভর কৃষিতে। কৃষিকে আইটি সেক্টরের ব‌্যবহার এবং রফতানিমুখীকরণ করা সময়ের দাবি। কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। যেকোন কাজই সঠিক এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণে ঘাটতি থাকলে যত ভালো কাজ হোক না কেন বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

আবার পরিকল্পনা গ্রহণ করার পর সঠিক বাস্তবায়নের সমস্যার কারণে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বাস্তবতা বিবেচনা এনে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের গুরত্ব যত দ্রুত দেয়া যাবে দেশের কৃষি, কৃষক এবং পুরো বাংলাদেশের মঙ্গল তত দ্রতই হবে। আসন্ন বাজেটে সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় কৃষিতে প্রাধান‌্য প্রদান করা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ আরিফুর রহমান

প্রকল্প পরিচালক, ডিএই এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মী

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD