Logo

১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাদক কেলেঙ্কারিতে ‘নিষিদ্ধ’ হন ম্যারাডোনা

profile picture
ক্রীড়া ডেস্ক
৯ জুন, ২০২৬, ১৭:৪০
১৯৯৪ বিশ্বকাপে মাদক কেলেঙ্কারিতে ‘নিষিদ্ধ’ হন ম্যারাডোনা
ছবি: সংগৃহীত

ডিয়েগো ম্যারাডোনার ফুটবল মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও বেদনাদায়ক। এটি এমন এক গল্প যেখানে জড়িয়ে আছে চারটি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, এমন এক ফুটবল কিংবদন্তির আখ্যান যাকে একই মলাটে পূজা করা হয়েছে আবার ঘৃণাও করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাঠে ছিলেন মাত্র দুটি ম্যাচে, মোট ১৭৩ মিনিট। তবে এই ১৭৩ মিনিটের আগের প্রস্তুতি আর পরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ম্যারাডোনার চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপের আসল ট্র্যাজেডি।

১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে বিশ্ব ফুটবলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডে প্রিমিয়ার লিগ চালু হওয়ার পর ফুটবল ধীরে ধীরে কেবল খেলাধুলা নয়, বরং বাণিজ্যিক ‘পণ্য’-এ পরিণত হতে শুরু করে। এ সময় নেপলসে অবস্থানকালে ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে মাফিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মাদক ও অ্যালকোহল আসক্তির গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের মার্চে সেই গুঞ্জন বাস্তবে রূপ নেয়। ইতালির সেরি-আ লিগের একটি ম্যাচের পর ডোপ পরীক্ষায় তার শরীরে কোকেনের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপরই ফিফা তাকে ১৫ মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে।

কিছু সূত্র দাবি করত যে বার্সেলোনায় থাকার সময় থেকেই ডিয়েগো মাদকের সাথে লড়াই করছিলেন; এবার সেই সব গুঞ্জন এক নির্মম সত্যে রূপ নেয়।

ব্রিটিশ মিডিয়া, যারা ম্যারাডোনার নামের পাশে সব সময় ‘প্রতারক’ শব্দটা ব্যবহার করতে ভালোবাসত, তারা এবার পরম আনন্দে তার গায়ে ‘নেশাখোর’ তকমা সেঁটে দিল।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনায় চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল ভক্তদের। অনেকের কাছেই ম্যারাডোনা ছিলেন আবেগ, ভালোবাসা এবং জীবনের অংশবিশেষ।

নিষেধাজ্ঞার পর আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনাকে ছাড়াই পরবর্তী বিশ্বকাপে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ডিয়েগো সিমিওনে আর অভিজ্ঞ ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনা সহজেই কোয়ালিফাই করবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক ধারণা। তবে তা হলো না। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সুযোগ পেতে হলে খেলতে হবে বাছাই পর্ব। আর সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে না পারলে বিশ্বকাপ বাসায় বসে দেখতে হবে আলবেসিয়েস্তাদের।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু যখন বিপর্যয় ঘনিয়ে এলো, তখন গোটা আর্জেন্টিনা এক সুরে ডেকে উঠল তাদের ত্রাণকর্তাকে। বাসিলের দল কোনোমতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুই লেগের এক প্লে-অফ খেলার সুযোগ পেয়েছিল। এই শেষ বাধা পার হতে হলে তাদের ‘এল ডিয়েগো’-কে প্রয়োজন ছিল।

ম্যারাডোনা ফিরলেন আকাশি-সাদা জার্সিতে। প্রথম লেগ অস্ট্রেলিয়ায় ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর, বুয়েনস আইরেসে দ্বিতীয় লেগে তার নেতৃত্বে ১-০ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা। গোলটি প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তিত হয়ে জালে জড়ালেও আর্জেন্টিনার মানুষের তাতে কিছু যায় আসেনি—তাদের দল বিশ্বকাপে পৌঁছে গেছে, আর তাদের ত্রাতা স্বয়ং ম্যারাডোনা নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, এটাই ছিল পরম সত্য।

মুক্ত মানুষের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ শুরু হলো। ইংল্যান্ড না থাকলেও চেনা সব পরাশক্তিরা হাজির ছিল—ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড, স্পেন এবং আর্জেন্টিনা।

বিজ্ঞাপন

মূল টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচের ঠিক আগে, ফেব্রুয়ারি মাসে ম্যারাডোনা হঠাৎ দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন। তার দাবি ছিল—তার ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং আর্জেন্টিনার মানুষের এই বিশাল প্রত্যাশার মানসিক বোঝা তিনি আর বইতে পারছেন না।

এরপর সাংবাদিকেরা ব্যাখ্যার দাবিতে দুই দিন ধরে তার বাড়ির সামনে তাঁবু গেড়ে অবস্থান নিলেন। ম্যারাডোনা মুখে কিছু না বলে নিজের ড্রাইভওয়ে থেকে একটি এয়ার রাইফেল দিয়ে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে বসলেন!

এতে চারজন মিডিয়াকর্মী আহত হলেন, পুলিশ এলো এবং আইনি মামলা হলো।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি গুঞ্জন ছিল আরও ভয়াবহ। বাতাসে ভাসছিল যে ফিফা নাকি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ম্যারাডোনার মাদক নেওয়ার ব্যাপারে জানত এবং টুর্নামেন্টে তাকে ফিট করার জন্য ডোপ টেস্ট থেকে এক ধরণের অলিখিত ছাড় বা ‘ইমিউনিটি’ দিয়েছিল। কারণ ফিফা ভয় পাচ্ছিল যে ম্যারাডোনা না থাকলে এই টুর্নামেন্টে দর্শকদের টানার মতো কোনো বড় ‘সুপারস্টার’ থাকবে না।

অবশেষে শুরু হয় পঞ্চদশ বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে ৫৪ হাজার দর্শকের সামনে গ্রিসের বিপক্ষে মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। শক্তিশালী দল হিসেবে তারা ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার।

বিজ্ঞাপন

গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই আধিপত্য দেখায়। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা দুটি গোল করে প্রথমার্ধেই দলকে ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। এই ম্যাচে ম্যারাডোনাকে দেখা যায় নতুন ভূমিকায়—তিনি আর আগের মতো এককভাবে প্রতিপক্ষ ভেঙে ফেলা খেলোয়াড় নন, বরং এক টাচ পাসে পুরো দলের খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। কম ছোঁয়াতেই তিনি ছিলেন মাঠের অধিপতি।

ম্যাচের ৬০তম মিনিটে আসে সেই স্মরণীয় মুহূর্ত। গ্রিসের বক্সের বাইরে একাধিক দ্রুত এক টাচ পাসের মাধ্যমে তৈরি হয় আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত বল যায় ম্যারাডোনার পায়ে। প্রথম টাচে বল নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয় টাচে শটের জায়গা তৈরি এবং তৃতীয় টাচে শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠান তিনি। বলটি গিয়ে লাগে উপরের বাম কোণে—গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।

চারপাশে চারজন ডিফেন্ডার থাকা সত্ত্বেও সেই ১০ নম্বর জার্সিধারী যেন আবারও দেখালেন পুরোনো জাদু। টেলিভিশনে বারবার বিভিন্ন কোণ থেকে সেই গোলের রিপ্লে দেখানো হচ্ছিল। আর একদম শেষ রিপ্লেতে দেখানো হলো তার সেই উদযাপনের দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

সাইডলাইনের দিকে দৌড়ে এসে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে সরাসরি তাকিয়ে আছেন ডিয়েগো; চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় বড়, মুখ হা করা—যার ভেতর থেকে এক আদিম চিৎকার বেরিয়ে আসছিল, এবং একপর্যায়ে নিজের মাথাটা ক্যামেরার লেন্সের একদম সামনে নিয়ে এলেন। হ্যান্ড অব গড কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ১০.৮০ সেকেন্ডের দৌড়ের মতোই এই ভিডিও ফুটেজটিও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক আইকনিক দৃশ্য হয়ে গেছে।

৮৩ মিনিটে যখন ম্যারাডোনাকে তুলে নেওয়া হলো, পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাকে করতালি দিল। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ৪-০ ব্যবধানে জিতল, বাতিস্তুতা তার হ্যাটট্রিক পূর্ণ করলেন। বাছাইপর্বের সব কষ্ট মানুষ ভুলে গেল।

পরের ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শুরুতেই গোল হজম করে আর্জেন্টিনা। মাত্র ৮ মিনিটে নাইজেরিয়া এগিয়ে যায়। তবে আর্জেন্টিনা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ২৮ মিনিটের মধ্যে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার জোড়া গোলে তারা ম্যাচে ফিরে আসে। দ্বিতীয় গোলের পেছনে ছিল ম্যারাডোনার দ্রুত নেওয়া একটি ফ্রি-কিকের বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকা।

বিজ্ঞাপন

আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতল। কিন্তু ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল—এক মেডিকেল নার্সের হাত ধরে মাঠ ছাড়ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ডোপ টেস্টের জন্য কোনো ফুটবলারকে এভাবে নার্স বা কর্তৃপক্ষের প্রহরায় মাঠ থেকে নিয়ে যাওয়া ফুটবলের মাঠে, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মঞ্চে অত্যন্ত বিরল এক দৃশ্য। তবে ম্যারাডোনার মুখে তখন চওড়া হাসি, গ্যালারির দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন, আর অন্য হাতটি তখনও সেই নার্সের হাতের মুঠোয়।

মাত্র চার দিন পর, ২৯ জুন; ফিফার তৎকালীন সেই ‘সততার প্রতীক’ সেপ ব্লাটার ঘোষণা করলেন, ‘উভয় মূত্র নমুনার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। আর্জেন্টিনা বনাম নাইজেরিয়া ম্যাচে ডোপিং নিয়ন্ত্রণ বিধি লঙ্ঘন করার দায়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।’

ম্যারাডোনার শরীরে এফেড্রিন নামের নিষিদ্ধ পদার্থ পাওয়া যায় যা মূলত পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এরপরই সঙ্গে সঙ্গেই তাকে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি হুলিও গ্রন্দোনা সিদ্ধান্ত নেন, বিতর্ক এড়াতে হলে ম্যারাডোনাকে দল থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধ করে বিশ্বকাপের বাজার আরও উত্তপ্ত করা হয়েছে। প্রেস কনফারেন্সে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে’। তাঁর দাবি ছিল, ব্যক্তিগত ট্রেইনার তাঁকে ‘রিপ ফুয়েল’ নামের এনার্জি ড্রিংক দিয়েছিলেন, যা আর্জেন্টিনায় বৈধ। কিন্তু সেটার আমেরিকান ভার্সনে ছিল এফেড্রিন, যা তিনি জানতেন না।

তিনি অভিযোগ করেন, তাকে নিষিদ্ধ করে বিশ্বকাপের বাজার আরও উত্তপ্ত করা হয়েছে। সত্যি বলতে ’৯৪ বিশ্বকাপের আমেজ বহুগুণে বেড়ে গিয়েছিল ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞার পর।

এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়। বিশ্বকাপ থেকে ফিরে তিনি আরও দুই বছর বোকা জুনিয়র্সের হয়ে খেলেন এবং এরপর বিদায় নেন ফুটবল থেকে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD