Logo

সার সংকট ও অনিয়ম ঠেকাতে চালু হচ্ছে ‘পবা সার ডটকম’

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহী
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৫৪
সার সংকট ও অনিয়ম ঠেকাতে চালু হচ্ছে ‘পবা সার ডটকম’
ছবি: সংগৃহীত

সারের সংকট, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও মজুতের অভিযোগ মোকাবিলায় ডিজিটাল নজরদারি চালু করতে যাচ্ছে রাজশাহীর পবা উপজেলা প্রশাসন। ‘পবা সার ডটকম’ নামে তৈরি করা এই ওয়েবসাইটে ডিলারদের সার মজুত, বিক্রি ও অবশিষ্টের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ওয়েবসাইটটির ঠিকানা pabasaar.com।

বিজ্ঞাপন

নতুন ব্যবস্থায় কোনো কৃষক কোথা থেকে কত পরিমাণ সার কিনেছেন, তার জমির আয়তন ও ফসল অনুযায়ী কত সার প্রয়োজন—এসব তথ্যও ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে একজন কৃষক একাধিক ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি না, তা সহজেই শনাক্ত করা যাবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এ ছাড়া কৃষকদের জন্য রাখা হয়েছে অভিযোগ জানানোর সুবিধা। সার দিতে অস্বীকৃতি, ওজনে কম দেওয়া, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া কিংবা রসিদ না দেওয়ার মতো অভিযোগ ওয়েবসাইটে জানানো যাবে। এ জন্য কৃষককে আলাদা করে নিবন্ধন বা লগইন করতে হবে না।

কেন এই উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন

পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীনের উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ডিলার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট তৈরিতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে সিল্কোরা কনসালটেন্সি লিমিটেড।

ইউএনও বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কেন সংকট দেখা দিচ্ছে, তা জানতে কৃষক, ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এসব আলোচনায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কেনা ও আগাম মজুতের বিষয়টি উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘কোনো কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি না, তা আমরা জানতে পারব। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সেটি যাচাই করা হবে।’

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি পবায় একটি অভিযানে এক কৃষকের বাড়ি থেকে ১২৯ বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে বলে জানান ইউএনও। তার ভাষ্য, আলু চাষের জন্য ওই সার আগাম মজুত করা হয়েছিল। পরে জব্দ করা সার সরকারি কোষাগারে বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়।

একবার সার কিনলেই থাকবে তথ্য

পবা উপজেলায় বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ জন সার ডিলার রয়েছেন। নতুন ব্যবস্থায় তাদের বিক্রির তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে কোনো কৃষক সার কিনলে তার ক্রয়ের হিসাব সংরক্ষিত থাকবে। পরে তিনি অন্য কোনো ডিলারের কাছ থেকে সার কিনলে সেই তথ্যও একই ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কেনার বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সুপারিশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন বিবেচনায় নিয়ে সার দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের আশা, এতে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা কমার পাশাপাশি মাটির গুণগত মানও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ডিলারের মজুতও থাকবে নজরদারিতে

বিজ্ঞাপন

ওয়েবসাইটে ডিলারদের জন্য আলাদা পেজ থাকবে। সেখানে কৃষকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানা, কোন ফসলের জন্য সার নেওয়া হচ্ছে এবং কী পরিমাণ সার নেওয়া হচ্ছে—এসব তথ্য দিতে হবে।

ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ও জিপসামসহ বিভিন্ন সারের পরিমাণ দেওয়ার পর নির্ধারিত মূল্যে মোট দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হবে। ফলে নির্ধারিত দামের বাইরে সার বিক্রির সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিলারের মজুত, বিক্রি ও অবশিষ্ট সার প্রশাসনের ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। এতে কোনো ডিলারের কাছে সার থাকার পরও তিনি ‘সার নেই’ বলছেন কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করবেন কৃষি কর্মকর্তারা

শুধু অনলাইনে তথ্য সংরক্ষণ নয়, ডিলারের দোকানও নিয়মিত পরিদর্শন করবেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের জন্য ওয়েবসাইটে পৃথক আইডি থাকবে।

পরিদর্শনের সময় মজুতের হিসাব, সরকারি মূল্যতালিকা প্রদর্শন, নির্ধারিত দামে সার বিক্রি, কৃষককে রসিদ দেওয়া এবং ডিলারের লাইসেন্স ও বরাদ্দপত্র হালনাগাদ আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তার অবস্থানও সংরক্ষিত থাকবে। ফলে তিনি বাস্তবে মাঠে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন কি না, পরবর্তী সময়ে তা যাচাই করা যাবে।

ইউএনও জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাজ কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ১০ জন ট্যাগ কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ করবেন। এর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের একটি দল পুরো কার্যক্রম তদারক করবে।

চার স্তরের নজরদারি

বিজ্ঞাপন

‘পবা সার ডটকম’-এ চার স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম স্তরে কৃষক ও সাধারণ মানুষ কোনো লগইন ছাড়াই ডিলারদের সার মজুত ও দাম দেখতে পারবেন।

দ্বিতীয় স্তরে ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার বিক্রি ও মজুতের তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হবে। তৃতীয় স্তরে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে বিক্রি ও ডিলারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। তাদের কাজ তদারক করবেন কৃষি কর্মকর্তা ও ট্যাগ কর্মকর্তারা।

চতুর্থ স্তরে উপজেলা প্রশাসন কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এতে সার সরবরাহ থেকে শুরু করে কৃষকের কাছে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারবেন কৃষক

সারসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও সরাসরি ওয়েবসাইটে জানানো যাবে। অভিযোগের সময় কৃষক জমির পরিমাণ, আগে সার পেয়েছেন কি না, চলতি মাসে কত সার প্রয়োজন, কোন ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং অভিযোগের ধরন উল্লেখ করতে পারবেন।

সার দিতে অস্বীকৃতি, ওজনে কম দেওয়া, রসিদ না দেওয়া ও বেশি দামে বিক্রির মতো অভিযোগ করা যাবে। প্রয়োজনে অভিযোগের সঙ্গে ছবিও যুক্ত করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ইউনিয়নের নাম নির্বাচন করে কৃষকরা জানতে পারবেন, কোন ডিলারের কাছে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে।

পবার হরিয়ান ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মো. সাইদুর রহমান বলেন, কিছু কৃষক জমি না থাকলেও অতিরিক্ত টিএসপি চাওয়ার ঘটনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় অনলাইনে বিক্রির হিসাব থাকায় ডিলারদের ওপরও চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সব তথ্য মোবাইলে থেকে যাবে। কেউ এসে জোর করে বেশি সার নিতে পারবে না। ডিলারদের জন্যও ভালো হবে, টেনশন কমবে।’

পবার কসবা এলাকার কৃষক আকবর আলী জানান, সার কিনতে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারের দোকানে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, মোবাইলে জানতে পারব সার আছে কি না।’

খরচ প্রায় চার লাখ টাকা

ইউএনও মো. ইবনুল আবেদীন জানান, ওয়েবসাইট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও প্রচারসহ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কিছু প্রচার ব্যয় হতে পারে।

সরকারি ডোমেইন pabasaar.gov.bd পাওয়া গেলে ব্যয় আরও কমবে বলে জানান তিনি। এসএমএস ব্যবস্থার খরচ কমানো গেলে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমবে। একটি উপজেলার জন্য বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হতে পারে বলে জানান ইউএনও।

সফল হলে পুরো জেলায় সম্প্রসারণ

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতেই পবায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, একজন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কত বিক্রি করেছেন এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে—এসব তথ্য ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। এতে সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।

জেলা প্রশাসক জানান, পবায় পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে রাজশাহী জেলার অন্য উপজেলাতেও একই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD