Logo

বগুড়ায় কৃষকের জন্য নির্মিত চার বাজারে সুফল নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শেরপুর, বগুড়া
১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭:৩৬
বগুড়ায় কৃষকের জন্য নির্মিত চার বাজারে সুফল নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা
ছবি: প্রতিনিধি

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বগুড়ায় প্রায় ১৯ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল চারটি গ্রোয়ার্স মার্কেট বা কৃষক উৎপাদক বাজার। এসব বাজারে কৃষকের সরাসরি পাইকারদের কাছে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি গ্রেডিং, প্যাকিং, ধোয়া, পণ্য ওঠানো-নামানো ও সংরক্ষণের সুবিধা তৈরি করা হয়।

বিজ্ঞাপন

নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাখা হয়েছিল আলাদা কর্নারও। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাজারগুলোর প্রত্যাশিত সুফল কৃষকেরা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং এসব অবকাঠামোর সুবিধা নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা।

শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এলাকার পাইকারি বাজারে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ দোকান অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শাহজাহানপুর উপজেলার দুবলাগাড়ী হাটের বাজার সপ্তাহে দুই দিনের বেশি সচল থাকে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শিবগঞ্জের মহাস্থানেও খুচরা বাজার প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শেরপুরের মির্জাপুর এলাকার বাজারে আগের মতো কার্যক্রম নেই।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নির্মিত এসব বাজারে কৃষকদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও পণ্য বিপণনের কার্যক্রম প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি।

বিজ্ঞাপন

‘উত্তর-পশ্চিম শস্য বহুমুখীকরণ’ প্রকল্পের (এনসিডিপি) আওতায় বগুড়ায় চারটি গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে এসব বাজারের অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০০৯ সালে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাজারগুলোর এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে থাকা কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য এসব বাজারে এনে সরাসরি বিক্রি করবেন। পরে বড় পাইকারদের মাধ্যমে পণ্য ঢাকা ও দেশের অন্যান্য এলাকায় পাঠানো হবে। এ জন্য কৃষকদের বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল।

বাজারগুলোতে প্যাকিং হাউস, গ্রেডিং, সর্টিং, ওয়াশিং ও ড্রাইং ইউনিট, পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা, সংরক্ষণাগার, নারী কর্নার, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, শেরপুরের আরডিএ এলাকার পাইকারি বাজারে কার্যক্রম আগের তুলনায় কমেছে। স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, দুই বছর আগেও বাজারটি ভালো চলত। তবে মহাসড়কে ফ্লাইওভার না থাকায় সড়কের আইল্যান্ডের কারণে যানবাহন চলাচল ও পারাপারে সমস্যা হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, বাজারে বরাদ্দ পাওয়া ১৬ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ১৫ জনই অন্যত্র ব্যবসা করছেন। তাঁদের বরাদ্দ পাওয়া দোকানগুলো অন্যদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসব দোকানে মুদি পণ্য, লুঙ্গি ও ওষুধের ব্যবসা চলছে বলে জানান তাঁরা।

শেরপুরের মির্জাপুর এলাকার এনসিডিপি মার্কেটের অবস্থাও নাজুক। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি এনে বিক্রির ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে সেই কার্যক্রম কার্যত নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ছয়জন মহাজন অন্য জেলা থেকে পণ্য কিনে এনে ভবনটিতে বিক্রি করেন। মার্কেটের বাইরে থাকা ৩৪টি কাঁচামালের দোকান থেকে মহাজনেরা প্রতি মাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়া নেন। নারী কর্নারও কার্যকর হয়নি বলে জানান ব্যবসায়ী মাসুদ রানা, মহাজন আবদুল মান্নানসহ একাধিক ব্যক্তি।

বিজ্ঞাপন

শাহজানপুর উপজেলার দুবলাগাড়ী হাটের গ্রোয়ার্স মার্কেটেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সপ্তাহে মাত্র দুই দিন বাজারটি কিছুটা সচল থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারী কর্নার চালু হয়নি। স্থানীয় সদস্য কৃষকদের পরিবর্তে ইজারাদারেরা বাজার পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানে পাইকারি সবজির বাজারে কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও কৃষকদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এক কৃষকের ভাষ্য, খুচরা বাজারটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাজার কমিটির কার্যক্রমও সীমিত।

বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটি একটি এনজিওর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কৃষকদের একটি গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে বাজার পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্যকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বাজারগুলোতে কৃষিপণ্য গ্রেডিং এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা রয়েছে। স্থাপনাগুলো সংস্কার করা হলে কৃষকেরা আরও সুবিধা পাবেন। বাজারের সদস্যরাই পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।

দোকান বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী আবেদন করেননি। এ কারণে তাঁরা বরাদ্দ পাননি। নিয়ম মেনেই দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, নারী কৃষকদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হবে। কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে বাজারগুলো আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের আওতায় সবজি, ফল, মসলা ও দানাশস্যসহ ৩৩ ধরনের উচ্চমূল্যের ফসলের বহুমুখীকরণ ও নিবিড় উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানো, দারিদ্র্য কমানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রায় দুই দশক পর বাজারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কৃষকের জন্য নির্মিত এসব বাজারে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করা, অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার এবং নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD