Logo

মোদিবিরোধী ক্ষোভে উত্তাল ভারত, রাজপথে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৩৮
মোদিবিরোধী ক্ষোভে উত্তাল ভারত, রাজপথে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পুলিশের ব্যারিকেড, বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড় এবং তরুণদের প্রতিবাদ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় দেশটির তরুণদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় অনেক যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন। একই সঙ্গে এর ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা।

বিজ্ঞাপন

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রতিবাদে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে যান ২২ বছর বয়সী অর্থনীতির শিক্ষার্থী কাশিশ রাওয়াত। রাজধানীতে যাওয়ার বিষয়টি তিনি পরিবারের সদস্যদেরও জানাননি। সেখানে পৌঁছে বিভিন্ন সড়কে পুলিশের ব্যারিকেড দেখতে পান তিনি। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে গিয়ে পুলিশ কাউকে মারধর করছে, কাউকে টেনেহিঁচড়ে বাসে তুলছে—এমন দৃশ্যও তাঁর চোখে পড়ে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে অনেককে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের ধারণ করা এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের কঠোর অবস্থানেও দমে যাননি কাশিশ। সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান করে তিনি জানান, তাঁরা প্রতিবাদ বন্ধ করবেন না। নিজেদের দাবি জানাতে আবারও রাজপথে ফিরে আসবেন।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ১৩ কোটির বেশি নাম

বিজ্ঞাপন

ভারতে গত বছর থেকে ভোটার তালিকা ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকায় একাধিকবার থাকা নাম এবং ভোট দেওয়ার যোগ্যতা নেই—এমন ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে লাখো কিংবা আরও বেশি নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে।

এই ইস্যুতে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁদের মতে, ভোট দেওয়ার অধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যে এ প্রতিবাদ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর দলের কয়েকজন নেতা বিক্ষোভকারীদের নৈরাজ্যবাদী বলে আখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁর শাসনামলে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন মহল উদ্বেগ জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিমদের, লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।

তবে সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভিন্নমত দমনের জন্য নয়, বরং আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

কিন্তু অনেক তরুণের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি ভিন্ন। তাঁদের ধারণা, সরকারের সমালোচনা করলেই বাধা, হয়রানি কিংবা গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে হতে পারে। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক তাঁদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নানা বিষয়ে জমে থাকা হতাশা এখন ভোটাধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার দাবিকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে চলতি বছরের গ্রীষ্মে তরুণদের আন্দোলনের চাপে মোদির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। সেই ঘটনা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে। তাঁদের ধারণা, রাজপথে সংগঠিত প্রতিবাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণেরা

১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেইরোও ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। শনিবারের (১০ অক্টোবর) প্রতিবাদে দুই বন্ধুকে নিয়ে অংশ নেন তিনি। মায়া জানান, তাঁরা ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন, কারণ গণতন্ত্রে অংশ নেওয়াকে তাঁরা অধিকার ও দায়িত্ব—দুটিই মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে আরও নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তাঁদের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—ভোট দেওয়ার অধিকার কি সত্যিই সবার জন্য নিশ্চিত?

মায়ার মতে, নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য রাখা প্রয়োজন। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে তরুণদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ধীরে ধীরে সম্মিলিত প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে।

তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন নিজেদের অসহায় মনে হলেও আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাঁরা নতুন করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার শক্তি খুঁজে পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবাদ ঠেকাতে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে এমন আচরণ করা অযৌক্তিক।

২১ বছর বয়সী দর্শনের শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়ার মতে, ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তরুণদের বৃহত্তর হতাশার প্রতিফলন। তাঁর প্রশ্ন, কর্তৃপক্ষ যখন যেকোনো সময় সমাবেশে বাধা দিতে পারে কিংবা বিক্ষোভকারীদের আটক করতে পারে, তখন তাঁরা নিজেদের মতপ্রকাশের অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবেন?

আরিয়ানের ভাষ্য, রাজধানীতে কী ঘটছে, তা জানতে বিভিন্ন শহরের মানুষ চেষ্টা করছেন এবং আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে তাঁদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

দলীয় পরিচয়ের বাইরে প্রতিবাদ

এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। অনেকেই জানিয়েছেন, ভোটাধিকার রক্ষা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।

তবে মোদির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলা সহজ নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর দল বিজেপির রয়েছে শক্তিশালী নির্বাচনী সংগঠন। অন্যদিকে, অতীতের বিভিন্ন ইস্যুতে তৈরি হওয়া অসন্তোষকে স্থায়ী জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে বিরোধী দলগুলোকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তরুণদের বর্তমান আন্দোলনও এখনো সুসংগঠিত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলা এবং ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ সামনে আনাকেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখছেন।

আরও পড়ুন

কাশিশ রাওয়াতের পরিবারেও রাজনীতি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তাঁর ধারণা, পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মোদির দলের প্রতি সহানুভূতিশীল টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। মতের অমিলের কারণে কখনো কখনো আত্মীয়দের সঙ্গে কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তারপরও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কাশিশ।

অন্যদিকে, মায়া রিবেইরোর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তরুণেরা নিজেদের ক্ষোভকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে রূপ দিতে পারবেন কি না।

তাঁর বিশ্বাস, সাম্প্রতিক প্রতিবাদ তরুণদের মনে গণতন্ত্রের প্রতি নতুন করে আস্থা তৈরি করেছে। তবে রাজপথের এই ক্ষোভ কতটা স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে এবং ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের সমাধান কীভাবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র: এপি

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD