পিঁপড়েরা এত দ্রুত মিষ্টির খোঁজ পায় কীভাবে? জানুন রহস্য

রান্নাঘরে অসাবধানতাবশত কয়েক দানা চিনি পড়ে যাওয়া কিংবা টেবিলের নিচে মিষ্টির গুঁড়া জমে থাকা খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অল্প সময়ের মধ্যেই কোথা থেকে যেন সারি বেঁধে হাজির হয় পিঁপড়ের দল। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এত দ্রুত তারা কীভাবে মিষ্টি খাবারের অবস্থান বুঝে ফেলে?
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে রয়েছে পিঁপড়েদের অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি, রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার এবং দলগত যোগাযোগের দক্ষতা। মানুষের কাছে যা অদৃশ্য, পিঁপড়েদের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে খাবারের নির্ভুল নির্দেশনা।
শুঁড়ই পিঁপড়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র
পিঁপড়ের মাথার সামনে থাকা অ্যান্টেনা বা শুঁড় তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবেদনশীল অঙ্গ। এই শুঁড়ের সাহায্যে তারা মেঝে, দেয়াল কিংবা আশপাশের পরিবেশ থেকে নানা ধরনের রাসায়নিক সংকেত ও গন্ধ শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
ফলে রান্নাঘরে পড়ে থাকা চিনি, মধু, দুধ, মিষ্টির গুঁড়া কিংবা খাবারের ক্ষুদ্রতম কণাও তাদের নজর এড়িয়ে যায় না। শুঁড়ের মাধ্যমে তারা শুধু খাবারের উপস্থিতিই নয়, তার অবস্থানও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।
খাবার খোঁজে চলে দলগত অনুসন্ধান
গবেষকদের মতে, একটি পিঁপড়ের কলোনিতে সব সদস্য একই কাজ করে না। কিছু পিঁপড়ে শুধু অনুসন্ধানকারী হিসেবে কাজ করে। তারা দেয়ালের ফাঁক, জানালার কোণা, পাইপের আশপাশ কিংবা মেঝের কিনারা ধরে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে খাবারের সন্ধান চালায়।
বিজ্ঞাপন
কোনো একটি পিঁপড়ে যখন খাবারের উৎস খুঁজে পায়, তখন সেটি একা ফিরে যায় না। বরং কলোনিতে ফেরার পথে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে একটি পথচিহ্ন তৈরি করে।
ফেরোমোনই অন্য পিঁপড়েদের পথ দেখায়
পিঁপড়েদের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ফেরোমোন। এটি এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা তারা শরীর থেকে নিঃসরণ করে।
বিজ্ঞাপন
খাবার পাওয়ার পর ফেরার পথে পিঁপড়ে যে ফেরোমোনের রেখা তৈরি করে, সেটি পরবর্তী পিঁপড়েদের জন্য পথনির্দেশকের কাজ করে। অনেকটা আধুনিক জিপিএসের মতো এই রাসায়নিক পথ অনুসরণ করেই কলোনির অন্য সদস্যরা খুব দ্রুত খাবারের উৎসে পৌঁছে যায়।
ফলে প্রথমে একটি পিঁপড়ে খাবার আবিষ্কার করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে বড় একটি পিঁপড়ের সারি দেখা যায়।
মিষ্টি খাবারের প্রতি কেন এত আকর্ষণ?
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিঁপড়েরা শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। উদ্ভিদের মধুরস, ফল, গুড়, চিনি কিংবা মিষ্টি পানীয় তাদের জন্য সহজলভ্য শক্তির উৎস।
তাদের শরীরে থাকা বিশেষ স্বাদগ্রাহক (টেস্ট রিসেপ্টর) অত্যন্ত ক্ষুদ্র চিনির কণাও শনাক্ত করতে পারে। তাই মানুষের চোখে অদৃশ্য সামান্য মিষ্টির দাগও পিঁপড়েদের কাছে স্পষ্ট সংকেত হয়ে ওঠে।
গবেষণায় মিলেছে বিশেষ তথ্য
বিজ্ঞাপন
২০১২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য অনেক কীটপতঙ্গের তুলনায় পিঁপড়েদের শরীরে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ঘ্রাণ শনাক্তকারী রিসেপ্টর রয়েছে। এ কারণেই তারা অত্যন্ত সূক্ষ্ম গন্ধও সহজে ধরতে পারে।
এ ছাড়া ২০২১ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, পিঁপড়েদের শুঁড়ে থাকা বিশেষ স্বাদগ্রাহক ব্যবস্থা চিনির ক্ষুদ্রতম কণাও শনাক্ত করতে সক্ষম। এ কারণেই রান্নাঘরে পড়ে থাকা সামান্য চিনি বা মিষ্টির অবশিষ্টাংশও দ্রুত তাদের নজরে আসে।
রাসায়নিক ভাষাতেই চলে যোগাযোগ
বিজ্ঞাপন
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, পিঁপড়েদের যোগাযোগ ব্যবস্থা মূলত রাসায়নিক সংকেতনির্ভর। তারা ফেরোমোনের মাধ্যমে একে অপরকে খাবারের অবস্থান, বিপদের সংকেত এবং চলাচলের দিক সম্পর্কে তথ্য দেয়।
যদি কোনো পিঁপড়ে বড় আকারের খাবার খুঁজে পায়, যা একা বহন করা সম্ভব নয়, তাহলে সেটি কলোনিতে ফিরে গিয়ে ফেরোমোনের পথ তৈরি করে। সেই রাস্তা অনুসরণ করেই অন্য পিঁপড়েরা দলবদ্ধভাবে এসে খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
কেন এত দ্রুত ভিড় জমে?
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একটি পিঁপড়ে খাবার খুঁজে পাওয়ার পর ফেরোমোনের যে রাস্তা তৈরি করে, তা অনুসরণ করে দ্রুত আরও অসংখ্য পিঁপড়ে সেখানে পৌঁছে যায়। প্রত্যেক নতুন পিঁপড়েও আবার একই পথে ফেরোমোন ছড়িয়ে দেয়। ফলে রাসায়নিক সংকেত আরও শক্তিশালী হয় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খাবারের চারপাশে বড় একটি পিঁপড়ের সারি তৈরি হয়।
অর্থাৎ, পিঁপড়েদের মিষ্টি খুঁজে পাওয়ার পেছনে কাজ করে তাদের অত্যন্ত উন্নত ঘ্রাণশক্তি, শুঁড়ে থাকা সংবেদনশীল রিসেপ্টর, রাসায়নিক সংকেত এবং অসাধারণ দলগত সমন্বয়। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর সংগঠিত আচরণ আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে।








