সাদা সোনা কি অন্য কোনো ধাতু, কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা?

একসময় গহনা বলতে সবার চোখে ভেসে উঠত ঐতিহ্যবাহী হলুদ সোনার ঝলক। তবে সময়ের সঙ্গে ফ্যাশন ও রুচির পরিবর্তনে এখন ক্রেতাদের নজর কাড়ছে সাদা সোনা বা ‘হোয়াইট গোল্ড’। বিশেষ করে বিয়ের আংটি, এনগেজমেন্ট রিং, হীরা বসানো নেকলেস এবং আধুনিক ডিজাইনের অলংকারে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন—সাদা সোনা কি সত্যিই সোনা, নাকি এটি অন্য কোনো ধাতু? আর এর দামই বা কেন এত বেশি?
বিজ্ঞাপন
সাদা সোনা আসলে কী?
নামের কারণে অনেকেই মনে করেন, এটি প্রকৃতিতে পাওয়া কোনো সাদা রঙের মূল্যবান ধাতু। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। খাঁটি সোনা স্বাভাবিকভাবেই হলুদ রঙের। সাদা সোনা তৈরি করা হয় খাঁটি সোনার সঙ্গে প্যালাডিয়াম, নিকেল, রুপা বা জিংকের মতো সাদা ধাতু নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে। ফলে এটি একটি সংকর ধাতু (অ্যালয়) হিসেবে তৈরি হয়।
তবে এই সংকর ধাতু পুরোপুরি উজ্জ্বল সাদা হয় না। তাই অধিকাংশ সাদা সোনার গহনার ওপর রোডিয়ামের একটি পাতলা আবরণ দেওয়া হয়। এই প্রলেপের কারণে গহনাটি আরও উজ্জ্বল, চকচকে এবং প্লাটিনামের মতো আকর্ষণীয় দেখায়।
বিজ্ঞাপন
এটি কি খাঁটি সোনা?
সাদা সোনা শতভাগ খাঁটি সোনা নয়, তবে এতে সোনা থাকে। কতটুকু সোনা রয়েছে, তা নির্ভর করে ক্যারেটের ওপর। ১৮ ক্যারেট সাদা সোনা: প্রায় ৭৫ শতাংশ সোনা। ১৪ ক্যারেট সাদা সোনা: প্রায় ৫৮.৫ শতাংশ সোনা। ২৪ ক্যারেট সোনা প্রায় শতভাগ বিশুদ্ধ হলেও অতিরিক্ত নরম হওয়ায় সাধারণত গহনা তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হয় না।
অর্থাৎ সাদা সোনার রং আলাদা হলেও এর মূল উপাদান সোনাই।
বিজ্ঞাপন
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে সাদা সোনা?
গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে আধুনিক অলংকারে সাদা সোনার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হীরা বসানো গহনায় এটি বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ সাদা রঙের পটভূমিতে হীরার ঝলক আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
এ ছাড়া এর আধুনিক ও মার্জিত নকশা অফিস, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও উপযোগী। পশ্চিমা ফ্যাশনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে যাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
সাদা সোনা ও প্লাটিনাম কি একই?
অনেকেই সাদা সোনা এবং প্লাটিনামকে একই ধাতু মনে করেন, কিন্তু বাস্তবে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্লাটিনাম একটি স্বতন্ত্র মূল্যবান ধাতু, যা স্বাভাবিকভাবেই সাদা। অন্যদিকে সাদা সোনা হলো সোনাভিত্তিক সংকর ধাতু। সাদা সোনার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে রোডিয়ামের প্রলেপ দেওয়া হয়, যা সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পরে আবার নতুন প্রলেপ দিয়ে আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সাদা সোনার দাম কেন বেশি?
বিজ্ঞাপন
মূলত সাদা সোনার দাম নির্ভর করে এতে থাকা সোনার পরিমাণের ওপর। একই ক্যারেটের হলুদ সোনা ও সাদা সোনার মৌলিক মূল্য প্রায় সমান হলেও সাদা সোনা তৈরিতে অতিরিক্ত সংকর ধাতু ব্যবহার এবং রোডিয়াম প্রলেপ দেওয়ার কারণে প্রস্তুত ব্যয় বা মেকিং চার্জ কিছুটা বেশি হয়। এ কারণেই বাজারে এর বিক্রয়মূল্য তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশের বাজারে ১৮ ও ১৪ ক্যারেট সাদা সোনার গহনার দাম সাধারণত একই মানের হলুদ সোনার কাছাকাছি থাকে। তবে নকশা, ওজন, ব্র্যান্ড, শ্রমমূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওপর চূড়ান্ত মূল্য নির্ভর করে।
বর্তমানে দেশের বাজারে (৬ আগস্ট অনুযায়ী) ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ভ্যাটসহ ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা।
বিজ্ঞাপন
কেনার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
সাদা সোনার গহনা কেনার সময় অবশ্যই ক্যারেট এবং হলমার্ক যাচাই করা উচিত। বিশ্বস্ত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা সবচেয়ে নিরাপদ। যাদের নিকেলে অ্যালার্জি রয়েছে, তারা প্যালাডিয়াম-ভিত্তিক সাদা সোনা বেছে নিতে পারেন।
রং পরিবর্তন হলে কী করবেন?
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে রোডিয়ামের প্রলেপ ক্ষয়ে গেলে গহনায় হালকা হলুদাভ আভা দেখা দিতে পারে। এটি স্বাভাবিক ঘটনা। দক্ষ জুয়েলারির মাধ্যমে পুনরায় রোডিয়াম প্রলেপ করালে গহনা আবার আগের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
গহনার স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্লিচ, শক্তিশালী রাসায়নিক বা ক্লিনার থেকে দূরে রাখা উচিত। ব্যবহারের পর নরম কাপড়ে মুছে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন এর সৌন্দর্য বজায় থাকে।
বিনিয়োগের জন্য কতটা উপযোগী?
বিজ্ঞাপন
বিনিয়োগের দিক থেকে সাদা সোনা ও হলুদ সোনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই। কারণ মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সোনার বিশুদ্ধতা ও ওজন। তবে গহনা বিক্রির সময় মেকিং চার্জের পুরো অর্থ সাধারণত ফেরত পাওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে অনেকেই সোনার বার বা কয়েনকে বেশি লাভজনক মনে করেন।
অন্যদিকে নান্দনিকতা, আধুনিক ডিজাইন এবং ব্যবহারিক দিক বিবেচনায় সাদা সোনা বর্তমানে বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রেতাদের কাছেও একটি জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।








