দুই হাত নেই, পা দিয়ে লিখে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছে দুঃখু মিয়া

জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা কখনোই তাঁর স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে জীবনসংগ্রামে এগিয়ে চলেছেন আলতাফ হোসেন, যিনি এলাকায় দুঃখু মিয়া নামে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
পা দিয়ে লিখেই সম্পন্ন করেছেন পড়াশোনা। এরপর জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও পাননি চাকরি। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে থেমে না গিয়ে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি বিদ্যালয়। সেই প্রতিষ্ঠানে এখন ১৪৫ শিশুকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় দুঃখু মিয়ার প্রতিষ্ঠিত প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং দুঃখু মিয়ার জীবনসংগ্রাম ও বিদ্যালয় পরিচালনার বিষয়ে খোঁজখবর নেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরের স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, আলতাফ হোসেন দুঃখু মিয়া শুধু নরসিংদীর গর্ব নন, তিনি সারা দেশের গর্ব। নিজের আত্মবিশ্বাস, কর্মস্পৃহা ও অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি সুগম করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন ও সরকার তার পাশে থাকবে।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলা এবং শিশুদের মধ্যে গাছ লাগানোর আগ্রহ তৈরির উদ্যোগের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বিদ্যালয়ের ১৪৫ শিশুর প্রত্যেকের জন্য গাছ আনা হয়েছে। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া চারাগুলো একদিন বড় বৃক্ষে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
দুঃখু মিয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, এত সুন্দর একটা চিন্তা থেকে উনি এখানে এসেছেন। উনি থেমে যাননি, হেরে যাননি। উনি নিজে এগিয়ে এসেছেন। আমি বলব, অন্যদের জন্য এটা অনেক বড় অনুপ্রেরণা। শুধু নরসিংদী নয়, সারা দেশের জন্য এটা গর্বের বিষয়। আমরা যদি সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে এভাবে এগিয়ে আসি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, দুঃখু মিয়ার স্বপ্নের বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে যা যা করণীয়, সেসব বিষয়ে কাজ করা হবে। বিদ্যালয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে এলাকার শিশুদের শিক্ষার ভবিষ্যৎও জড়িয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আলতাফ হোসেনের জন্ম ১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায়। তাঁর বাবা মৃত তমিজ উদ্দিন। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকায় শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হতে হয়েছে তাঁকে। দাদা আদর ও আক্ষেপ মিশিয়ে তাঁর নাম রেখেছিলেন দুঃখু মিয়া। তবে নামের সঙ্গে দুঃখ জড়িয়ে থাকলেও জীবনের প্রতিটি বাধা মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
নিজের পৈতৃক জমিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুঃখু মিয়া শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছেন না, বরং এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও ভূমিকা রাখছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত করা গেলে আরও বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান, পাঁচদোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাচ্চু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক তারিক হোসেন রানা এবং পাঁচদোনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব লোকমান হোসেনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিজ্ঞাপন
এ সময় জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে আলতাফ হোসেনকে অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের চারা ও স্কুলব্যাগ বিতরণ করা হয়।








