১৮৩৭ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার ২৩০০, তবুও বাজারে হাহাকার!

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েও মিলছে না এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাড়তি টাকা দিয়েও সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বিজ্ঞাপন
রূপগঞ্জের বিভিন্ন বাজার ও এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কোম্পানিভেদে ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কম থাকায় অনেক দোকান ও ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বেড়েছে দাম, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে সংকট।
সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ক্রেতাদের অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৩৬৩ থেকে ৪৬৩ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা।
সরবরাহ কম, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ডিলারদের দাবি, কোম্পানিগুলো থেকে নিয়মিত চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে না। সীমিত পরিমাণে পণ্য আসায় অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের নিয়মিত ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে কিছু খুচরা বিক্রেতা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে কেনাবেচার দাম নিয়েও রয়েছে মতবিরোধ।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর। বিশেষ করে ফ্ল্যাটবাড়িতে বসবাসকারী পরিবারগুলো বেশি সমস্যায় পড়ছেন। রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল এসব পরিবারের অনেকে সময়মতো সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে মাসিক সংসার খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
বাড়তি দামে গ্যাস কিনে বিপাকে পরিবারগুলো
বিজ্ঞাপন
উপজেলার মাসাব এলাকার গৃহিণী শাহানাজ বেগম বলেন, ‘সরকার যে দাম ঠিক করে দিয়েছে, সে দামে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ফ্ল্যাট বাসায় লাকড়ি-খড়ি দিয়ে রান্না করার সুযোগও নেই। তাই বেশি দামেই গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। স্বামীর অল্প আয়ে সংসার চলে। দাম এভাবে বাড়তে থাকলে সংসার চালানো কঠিন।’
আরেক গৃহিণী শামীমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দুই হাজার ৩০০ টাকায় কিনেছি। তাও কয়েক দোকান ঘুরেও পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর বাড়তি দাম। সিলিন্ডার গ্যাস নিয়ে সমস্যা আমাদের চরম ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে।’
পেশায় চা দোকানি সেলিম মিয়াও বাড়তি দামের কারণে আর্থিক চাপে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও ৪৬৩ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়ছে কিন্তু আমার দোকানের পণ্যের দাম তো বাড়াতে পারিনি। কারণ পণ্যের দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাবে। তাই বাড়তি খরচ আমাকেই গচ্চা দিতে হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
পাইকারি দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের
খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডার বিক্রি করেন সজীব আহম্মেদ। তাঁর দাবি, পাইকারি পর্যায়েই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সিলিন্ডারে সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু আমরা পাইকারি ধরে কিনেছি দুই হাজার ১০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায়। এর ওপর পরিবহন খরচ আছে। ফলে সামান্য লাভেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’
ডিলারদের বিরুদ্ধে বাড়তি দাম নেওয়ার পাশাপাশি রসিদ না দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। সজীব বলেন, ‘ডিলাররা দাম বেশি রাখছে কিন্তু আমাদের কোনো রসিদও দিচ্ছে না। রসিদ চাইলে মাল দেয় না। তাই কাস্টমার ধরে রাখতে বেশি দামে কিনছি। সে অনুপাতেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
ডিলারদের বক্তব্যে দামের হিসাব নিয়ে ভিন্নতা
ফ্রেস গ্যাসের ডিলার সালমান এন্টারপ্রাইজের মালিক সালমান বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, খুচরা বিক্রেতাদের প্রতি সিলিন্ডারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, ডিলার পর্যায়ে তাঁরা ৫০ টাকা লাভে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামের বেশি না নিতে বলা হলেও অনেকে তা মানছেন না।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, তীর বেঙ্গলের ডিলার শুভ্র গ্যাসের ম্যানেজার সহিদ মিয়া জানান, তাঁদের কাছে নিয়মিত সিলিন্ডার আসছে না। তিনি বলেন, ‘গত মাসের ১১ তারিখে কিছু মাল পেয়েছিলাম। চলতি মাসের এক তারিখে কিছু মাল পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনো মাল পাইনি।’
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এক হাজার ৭৩৭ টাকায় কিনছি। এর ওপর পরিবহন খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে সবশেষ এক হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি।’
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ অস্বীকার করে সহিদ মিয়া বলেন, ‘আমরা এক হাজার ৯৫০ টাকার বেশি নিই না। দোকানদাররা মিথ্যা বলছে। তবে অন্য কোনো ডিলার বেশি নেয় না, সেটা আমি বলছি না। অনেক ডিলার বেশি দামে বিক্রি করছে বলে শুনেছি।’
অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের
বিজ্ঞাপন
সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদ আল সোহান।
তিনি বলেন, নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কি-না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে রূপগঞ্জে সরবরাহ সংকটের স্থায়ী সমাধান কবে হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানা যায়নি। আপাতত বাড়তি দাম ও সিলিন্ডারের অপ্রতুলতার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।








