Logo

জামায়াতের ‘মুক্তিযোদ্ধা এমপি’ থেকে হত্যাচেষ্টার আসামি নজরুল

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৯:২০
জামায়াতের ‘মুক্তিযোদ্ধা এমপি’ থেকে হত্যাচেষ্টার আসামি নজরুল
ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম নতুন করে আলোচনায় এসেছেন একটি মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে যাওয়ার পর। এর আগে পল্লবী থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলাতেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর রাতে তার বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা মো. ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামসুজ্জোহা সরকার দুজনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালত সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা মেনে রিমান্ড কার্যক্রম শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মামলার এজাহার ও পুলিশের নথি অনুযায়ী, রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন তার বাবা।

ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। মরিয়মের বিছানা থেকে হাতে লেখা কিছু চিরকুট পাওয়ার কথাও মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীর অভিযোগ, এসব লেখায় দাম্পত্য সম্পর্ক, মানসিক কষ্ট, বিশ্বাসভঙ্গ ও পারিবারিক টানাপোড়েনের বিষয় উঠে এসেছে। তবে চিরকুটগুলো কে লিখেছেন, কোন পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছে এবং মৃত্যুর সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক কী—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।

বিজ্ঞাপন

বিয়ের পর নির্যাতনের অভিযোগ

এজাহারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। এরপর তারা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।

মরিয়মের বাবা অভিযোগ করেছেন, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও মাকছুদা তার মেয়েকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে মামলায় করা এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হয়নি।

রিমান্ড চাওয়ার পাঁচ কারণ

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পক্ষে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর সময় গাজী নজরুল ও মাকছুদার অবস্থান, মরিয়মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ও ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া মরিয়মকে কোনোভাবে মানসিক চাপ, ভয়ভীতি বা আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছিল কি না, মামলার পলাতক আসামি ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা কী এবং অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তথ্য পেতে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, চিরকুটের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হবে।

‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় তুলে রিমান্ডের বিরোধিতা

বিজ্ঞাপন

আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা গাজী নজরুলের বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি ও তার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় তুলে ধরে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, পারিবারিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই। তারা রিমান্ড আবেদন বাতিল করে আসামিদের মুক্তির আবেদন করেন।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী মামলার অভিযোগ, বিয়ের প্রেক্ষাপট এবং মৃত্যুর আগে পাওয়া চিরকুটের বিষয় তুলে ধরে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

পল্লবীর হত্যাচেষ্টা মামলাও রয়েছে

বিজ্ঞাপন

মরিয়মের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেই পল্লবী থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের নথি বিচারিক আদালতে দাখিল করেছিলেন গাজী নজরুল। গত ১০ আগস্ট হাইকোর্ট ওই মামলায় তাকে আট সপ্তাহের জামিন দেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পল্লবী থানার মামলাটি করেন গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। ওই মামলায় গাজী নজরুল ছাড়াও আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসানকে আসামি করা হয়। এজাহারে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

জামায়াত থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত

বিজ্ঞাপন

গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্কের পর গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

দলটির পক্ষ থেকে তখন স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। গাজী নজরুল অবশ্য এর আগে দাবি করেছিলেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তিনি মরিয়মকে বিয়ে করেছেন।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় এখন আদালতের দেওয়া রিমান্ডে গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তদন্ত ও ময়নাতদন্তসহ সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার কথা রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD