Logo

সৌদি আরব আর নিরাপদ নয়, হামলার আতঙ্কে প্রবাসী পরিবারগুলো

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২১:৪৫
সৌদি আরব আর নিরাপদ নয়, হামলার আতঙ্কে প্রবাসী পরিবারগুলো
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দীর্ঘদিন নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। তবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার খবরের পর প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বসবাসরত অনেক প্রবাসী এখন নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে পাঠানোর কথাও ভাবছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন দ্বিতীয় দফার হামলায় আরও একজন নিহত ও অন্তত ১১ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হুথিরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন এবং সানা বিমানবন্দরে সৌদি জোটের হামলার জবাব হিসেবেই এসব আক্রমণ চালানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়ায় প্রচারিত বিমানবন্দরের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে যাত্রীদের আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মক্কায় ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা হামলার সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিমানবন্দরের অপেক্ষাকক্ষে ধুলা ছড়িয়ে পড়া এবং ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়ার দৃশ্যও ফুটেজে দেখা যায়।

পরিস্থিতি খারাপ হলে পরিবারকে দেশে পাঠানোর ভাবনা

সাত বছরের বেশি সময় ধরে রিয়াদে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ধর্মীয় সফরে থাকা মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কায় থাকার কথা নয়। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরবে ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন থাকায় দেশটি ছেড়ে যাওয়া তাঁর জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয় বলে জানান বিলাল। তবে হামলা আরও ঘন ঘন ঘটলে পরিবারকে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানান তিনি।

সৌদি আরবে বিভিন্ন সময়ে এক দশক ধরে বসবাস করা আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর সন্তানরা এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু প্রবাসীর দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার খবরের কারণে সন্তানদের আশ্বস্ত করাও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ।

অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় উদ্বেগ

বিজ্ঞাপন

হুথিদের হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পর্যটন ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে দেশটিকে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে সৌদি সরকার।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদে একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রতিনিধি অংশ নেন। দুই সপ্তাহ পর দেশটিতে ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিমানবন্দরে হামলার পর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশের বার্তা দেওয়া সৌদি সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাব

বিজ্ঞাপন

ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। ২০১৪ সালে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট গভীর হওয়ার পর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এর জবাবে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করাই ছিল অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য। দীর্ঘ সংঘাতে ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও জরুরি পরিষেবার বিপর্যয়সহ বিভিন্ন কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তবে হুথিদের হামলা এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে এসব পরিকল্পনা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় সৌদি আরব লোহিত সাগরকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচল নিয়ে হুথিদের হুমকির কারণে এই পথের নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্কের কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক সামনে এনেছে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো ও সামরিক প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে এসব দেশ মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক উপসাগরীয় বিশ্লেষকের মতে, ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং সৌদি আরবের ওপর হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্যও দেশটির হতাশা বাড়িয়েছে বলে ওই বিশ্লেষক মনে করেন।

এ পরিস্থিতিতে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চুক্তিটির লক্ষ্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করা। তবে তুরস্কের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের সময় ও পরিসর সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন, প্রবাসী কর্মীদের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কেও।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD