Logo

‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাত করেছে ’, দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৭
‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাত করেছে ’, দিল্লিতে আটক বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে আটক হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী পুলিশের বিরুদ্ধে মারধর, দুর্ব্যবহার এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের কয়েকজন শরীরের আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছেন। তবে এসব ঘটনার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

বিবিসি আটক শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে। তাঁদের অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

নারী শিক্ষার্থীর পোশাক টেনে তোলার অভিযোগ

আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্য শরণ্যা শর্মাকে গত ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় আটক করা হয়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাসে তোলেন। এ সময় নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর পোশাক টেনে তোলেন এবং পুরুষ কমান্ডোরা জোর করে তাঁকে বাসে তোলার চেষ্টা করেন।

বিজ্ঞাপন

বিবিসিকে শরণ্যা বলেন, ‘একজন নারী পুলিশকর্মী আমার টি-শার্ট টেনে মাথার উপরে তুলে দিয়েছিল। আমাকে অপমান করার জন্যই করেছিল।’

তাঁর আরও অভিযোগ, পুলিশ তাঁর চুল ধরে টেনেছিল। যে বাসে তাঁকে তোলা হয়, সেটিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল না। বাসটির ভেতরে ছোট ছোট কয়েকটি খুপরিও ছিল বলে জানান তিনি।

শরণ্যার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে জোর করে বাসে তোলার সময় তাঁর পা বাইরে আটকে ছিল। এ অবস্থায় কমান্ডোরা লোহার দরজা বন্ধ করে দিলে তাঁর পা দরজায় আটকে যায়। বাসের ভেতরে থাকা চারজন নারী চিৎকার করে দরজা খোলার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে কয়েকজন পুরুষ জোর করে দরজা ঠেলতে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

শরণ্যা জানান, সকাল ১১টার দিকে তাঁকে আটক করে নাঙ্গলোইয়ের একটি আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। গভীর রাতে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটককেন্দ্রে খাবার, পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুবিধার অভাব ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘আধমরা অবস্থায় ফিরবে তুমি’

এসএফআইয়ের দিল্লি শাখার সভাপতি ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়াকেও ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় আটক করা হয়েছিল। বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরও ১২ অক্টোবর বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’র বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

নাদিয়ার অভিযোগ, আটক অবস্থায় নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁর চুল টেনেছেন, চিমটি কেটেছেন এবং মারধর করেছেন। মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেওয়ায় তাঁকে আরও মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

নাদিয়া বলেন, বাসে তাঁকে ছাড়া আরেকজন নারী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা তাঁদের টেনে বাসে তোলেন, চিমটি কাটেন এবং পা দিয়ে আঘাত করেন। গলা চেপে ধরে বসিয়ে রাখার অভিযোগও করেছেন তিনি।

বাসে থাকা অবস্থায় মোবাইল ফোন দিয়ে ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে একজন পুলিশ সদস্য তাঁর ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানান নাদিয়া। ফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করার পর তাঁর ওপর প্রায় ১৫ মিনিট ধরে মারধর চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

নিজের হাতের আঘাত ও কালশিটে পড়া দাগ দেখিয়ে নাদিয়া বলেন, এসব আঘাতের কিছু টানাহেঁচড়ার কারণে হয়েছে। তাঁর দাবি, চারজন পুলিশ সদস্য তাঁর ওপর চড়াও হয়েছিলেন। তাঁদের কেউ চিমটি কাটছিলেন, কেউ চুল ধরে টানছিলেন।

নাদিয়ার অভিযোগ, তাঁকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়েছিল, ‘তোমাকে আধমরা অবস্থায় ছাড়ব।’ তিনি কতটা মারধর করা হবে জানতে চাইলে তাঁকে আধমরা অবস্থায় ফিরে যেতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।

অন্য নারী বিক্ষোভকারীদেরও হেনস্তা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কয়েকজনের শার্ট টেনে মাথার ওপর তুলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁরা অপমানিত বোধ করেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নাদিয়ার মতে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এভাবে আটক ও নির্যাতন করা হচ্ছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে তিনি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

‘যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাত’, পিএইচডি গবেষকের অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

দিল্লিতে পিএইচডি করা নোভেল ১০ অক্টোবর ভগৎ সিংয়ের পোস্টার হাতে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে পুলিশকে তাঁকে আটক করতে এবং তাঁর পোস্টার নিয়ে যেতে দেখা যায়।

নোভেলের অভিযোগ, তাঁকে দিল্লি পরিবহন নিগমের কমলা রঙের একটি বাসে তুলে প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় পুলিশ সদস্যরা বারবার তাঁকে চড় মারেন। বাসটি পুলিশের নিয়মিত যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত হতো, কারাগারে নেওয়ার বিশেষ যান ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

নোভেল জানান, প্রথমে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে বাসে যেতে বলেন। পরে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাসে তোলা হয়। তিনি পড়ে গেলে তিন-চারজন পুলিশ সদস্য মিলে তাঁকে মারধর করেন। বাসটি এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল এবং প্রতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর পুলিশ সদস্যরা এসে তাঁকে চড় মারতেন বলে অভিযোগ তাঁর।

বিজ্ঞাপন

নোভেলের ভাষ্য, এর আগে একাধিকবার আটক হলেও এবার তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন। বাসে তিনি একা থাকায় পুলিশ সদস্যরা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কী ঘটছে, তা কেউ জানতে পারবে না।

তিনি আরও জানান, নিজেকে পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে এবং তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন বলে উল্লেখ করেও মারধর থেকে রেহাই পাননি। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নোভেলের অভিযোগ, আটক করার পর তাঁকে একটি প্রিজন ভ্যানে তোলা হলে একজন পুলিশ সদস্য তাঁর মুখে ঘুষি মারেন। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে চার-পাঁচটি ছোট খুপরি থাকা ভ্যানের ভেতরে তাঁকে মারধর করা হয়।

বিজ্ঞাপন

তাঁর দাবি, ভ্যানে থাকা একজন পুলিশ সদস্য তাঁকে যৌনাঙ্গে বুট দিয়ে আঘাত করেন, আরেকজন বুকে লাথি মারেন এবং অন্য একজন গলা চেপে ধরেন। পরে তাঁকে ভ্যানের একটি খুপরিতে পাঠানো হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তিনি আর বাধা দেননি বলে জানান।

প্রতিবেদনের অন্য অংশে অর্জুন নামে আরেকজনের অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর দাবি, আটক বাসে কয়েকজন নাবালকও ছিল এবং তাদের কয়েকজন আহত হয়। কারও কারও হাড় ভেঙে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

আটক সাংবাদিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য

১০ ও ১১ অক্টোবরের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিকও আটক হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি, আহমেদাবাদ ও পুনে মিলিয়ে অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৩৫ জনের বেশি দিল্লির সাংবাদিক ছিলেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক সাংবাদিকদের মধ্যে ‘স্ক্রল’, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’, ‘নিউজলন্ড্রি’ এবং ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি’র সাংবাদিকরাও ছিলেন।

১০ অক্টোবর আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর শোয়েব দানিয়াল ও আয়ুষ তিওয়ারি, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর অনুষ্কা ভরদ্বাজ এবং ‘নিউজলন্ড্রি’র অশ্বিনী কুমার সিং, আস্থা সব্যসাচী ও অনমোল প্রীতম। নিউজলন্ড্রির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছিল।

বিবিসি জানিয়েছে, কয়েকজন বিক্ষোভকারী তাঁদের অভিজ্ঞতার পক্ষে ভিডিও দেখিয়েছেন। তবে সেসব ভিডিও ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘটনাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD