Logo

মসজিদের খুতবা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মোদী সরকারের, মুসলিম নেতারা ক্ষুব্ধ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৪৬
মসজিদের খুতবা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মোদী সরকারের, মুসলিম নেতারা ক্ষুব্ধ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে একই ধরনের জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন স্থানীয় মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় চর্চা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জম্মু-কাশ্মীর ওয়াক্‌ফ বোর্ডের প্রধান দারাক্ষণ আন্দ্রাবি গত সপ্তাহে মসজিদগুলোতে অভিন্ন জুমার খুতবা চালুর প্রস্তাব ঘোষণা করেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় নেতা। তাঁর এ ঘোষণার পর অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে সমালোচনা শুরু হয়।

কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতেরা প্রস্তাবটিকে ধর্মীয় বিষয়ে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে আন্দ্রাবির দাবি, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় অভিন্ন খুতবা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রকে তিনি জানান, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে। ধর্মীয় পণ্ডিতেরা তা অনুমোদন করবেন এবং এতে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা থাকবে না বলে দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

গত রোববার কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় দেড় হাজার ধর্মীয় পণ্ডিত ও খতিবকে নিয়ে বৈঠক করে ওয়াক্‌ফ বোর্ড। তাঁদের কেউ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, আবার প্রত্যন্ত এলাকার অনেকে অনলাইনে যুক্ত হন।

রাজৌরি জেলার এক ধর্মীয় নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে তাঁরা জানতে পারেন, জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটির তৈরি ও পূর্বানুমোদিত খুতবা শুক্রবার মসজিদগুলোতে পাঠ করতে হবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা তাঁদের জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ধর্মীয় নেতা বলেন, খুতবায় ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী কিছু থাকলে তাঁরা নির্দেশনা মানবেন না বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের উদ্বেগ উপেক্ষা করা হয়েছে এবং কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ওই নেতার দাবি, আন্দ্রাবি তাঁদের জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত এবং এ নিয়ে চার বছর ধরে কাজ চলছে।

কাশ্মীরের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক নাঈম আখতার বলেন, ধর্মীয় বক্তাদের নিজস্ব পছন্দের বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাঁর মতে, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের দায়িত্ব মূলত ধর্মীয় সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা। খতিবেরা কী বিষয়ে বক্তব্য দেবেন, তা নির্ধারণের চেষ্টা বোর্ডের এখতিয়ার ছাড়িয়ে যাওয়ার শামিল।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারতের কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দল কি হিন্দু পুরোহিতদের পূজা পরিচালনার পদ্ধতি কিংবা খ্রিষ্টান যাজকদের ধর্মোপদেশের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দিতে পারে?

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার কাশ্মীরের শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও এ উদ্যোগের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, এটি ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। তাঁর নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় সংগঠনগুলোর যৌথ প্ল্যাটফর্ম মুতাহিদা মাজলিস-ই-উলামা জানায়, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ইসলামি পণ্ডিতদের, প্রশাসনিক সংস্থার নয়।

কাশ্মীরের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহও প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর দল ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে থাকলেও অঞ্চলটির বাতিল হওয়া স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।

সমালোচনার মুখে পরে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আন্দ্রাবি। তিনি জানান, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা ও মানসিক সংকটের মতো সামাজিক বিষয় নিয়ে খুতবায় আলোচনার সিদ্ধান্ত স্বাধীন ধর্মীয় পণ্ডিত, প্রচারক ও খতিবদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পর ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোটের দাবিও জানানো হয়েছে।

২০১৯ সালে ভারত কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে এবং অঞ্চলটিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় নেয়। একই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত রয়েছে; গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্বের বড় অংশ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হাতে।

বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর মুসলমানদের দান করা সম্পত্তি ও ধর্মীয় দাতব্য সম্পদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও আইনি পরিবর্তন আসে। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, এর ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

কাশ্মীরের মুসলিম ধর্মীয় নেতারা এর আগেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁদের অভিযোগ ছিল, পুলিশ মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে ‘মসজিদের পরিচিতি নির্ধারণ’ শিরোনামে চার পৃষ্ঠার একটি ফরম বিতরণ করেছে। তাঁদের দাবি, ওই ফরমে বায়োমেট্রিক তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়েছিল।

শ্রীনগরের প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো জামিয়া মসজিদেও ঈদের নামাজ ও পবিত্র রমজানের লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ধর্মীয় নেতাদের অভিযোগ, এতে তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ওয়াক্‌ফ বোর্ডের বিরুদ্ধে এর আগে বড় মাজারগুলোর চত্বরে হলুদ চাল বিতরণের দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। ২০২২ সালে ভক্তদের দেওয়া স্বেচ্ছামূলক নজর-ও-নিয়াজের অনুদান সংগ্রহের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে বোর্ড। অনুদান বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

কাশ্মীরের রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ নূর আহমদ বাবা বলেন, অঞ্চলটিতে রাজনৈতিক জনসমর্থন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা বা তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।

তাঁর মতে, মাদকাসক্তি, দেরিতে বিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয় নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের আলোচনা করা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করতে পারে কে উদ্যোগটি নিচ্ছে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার ওপর।

কাশ্মীরের সংঘাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করা শ্রীনগরভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, অঞ্চলটিতে বিক্ষোভের সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অভিন্ন খুতবার প্রস্তাবকে দেখা যেতে পারে। তাঁর ধারণা, ভারতের হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে অভিন্ন খুতবার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন, এর চূড়ান্ত কাঠামো এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ওয়াক্‌ফ বোর্ডের সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আপাতত এ উদ্যোগ ঘিরে ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রশাসনিক এখতিয়ার ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD