Logo

চাকরির প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ তরুণেরা

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২২
চাকরির প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ তরুণেরা
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। বেকারত্ব, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণসহ নানা ইস্যুতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার জন্য বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও আন্দোলনকারীদের রাজপথে নামা থামানো যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহে রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এক তরুণকে পুলিশ বাসে তোলার সময় ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়।

স্বাধীন গবেষণা সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) প্রজেক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ভারতে গত এক দশকের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি রাজপথের বিক্ষোভ হতে পারে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের পাশাপাশি জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের আন্দোলনে অংশগ্রহণও বাড়ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলোর প্রতি বাড়তে থাকা সমর্থন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদীর জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারতের প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের এক-চতুর্থাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। তবে আপাতত সরকার তার স্থিতিশীলতা হারানোর কোনো বড় সংকেত দেখায়নি। দেশটির পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন

সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, দেশ হঠাৎ করেই নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ঘিরে বিতর্ক, বাড়ছে বিক্ষোভ

দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পেয়েছে এবং কয়েকটি রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনে দলটির জয়ে ভূমিকা রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

তবে বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী মোদীর জনপ্রিয়তা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নির্বাচনে দলটির সাফল্যের প্রধান কারণ।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ অবশ্য শুধু নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে নয়। গত এক দশকের বেশি সময়ে ভারতের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে।

চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং মোদীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ধনকুবের ব্যবসায়ীদের প্রভাব নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অতীতে বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপেও তরুণদের একাংশের প্রতিবাদ থামেনি।

শনিবার দিল্লির বড় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা রাতুরি বলেন, “আমাদের মধ্যে আর ভয় নেই।”

বিক্ষোভকারীদের আটক করতে পুলিশের ব্যবহৃত একটি বাসের উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার আঁকড়ে ধরে থাকার পর তিনি আরও বলেন, আটক হওয়া বা পুলিশের মারধরের ভয় তাঁরা করেন না। তাঁর ভাষায়, এই প্রজন্ম আন্দোলনকে উপভোগ করে।

বিজ্ঞাপন

তবে বিক্ষোভকারীদের মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। তাদের দাবি, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

মোদী সরকারের আমলে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত আন্দোলনগুলোর মধ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অনলাইন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ গত জুনে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকারদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করার পর আন্দোলনটি নতুন গতি পায়।

বিজ্ঞাপন

সমালোচকদের অভিযোগ, ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ সরকারপন্থী হওয়ায় বিক্ষোভের খবর তুলনামূলকভাবে কম প্রচারিত হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও এবং ইউটিউবভিত্তিক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং বামপন্থী কর্মী নেহা বোরার মতো ব্যক্তিরা অনলাইনে পরিচিতি পেয়েছেন।

একই সময়ে দীর্ঘদিন তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় থাকা বিরোধী দলগুলোও নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও হাজারো সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

ভারতের পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের তুলনা করছেন কেউ কেউ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই দুই দেশে তরুণদের আন্দোলনের পর সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো ও মোদীর জনপ্রিয়তার কারণে দেশটির পরিস্থিতিকে একইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ মোদীর ক্ষমতায় আসার সময় বেড়ে উঠেছেন। তখন তাঁদের সামনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন সুযোগ এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এক দশক পর তাঁদের অনেকের অভিযোগ, প্রত্যাশা অনুযায়ী সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

তাঁদের আরও অভিযোগ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আওতায় সরকার ধর্মীয় বিষয় ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিভাজনমূলক রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, সরকার জানিয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে ভারতীয় অর্থনীতিতে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মোদী বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বারবার বলেছেন, তাঁর সরকার সব ভারতীয়ের জন্য কাজ করে।

কলকাতার ৩০ বছর বয়সী মেডিকেল শিক্ষার্থী গৌরী শেঠ ২০১৪ সালে প্রথমবার ভোটার হন। সে বছরই মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে।

গৌরী শেঠের অভিযোগ, মোদী সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলো পূরণ করতে পারেনি। তাঁর মতে, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য মৌলিক সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সরকার ধর্মীয় অবকাঠামোর মতো বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের সমালোচনা করলেই কাউকে রাষ্ট্রদ্রোহী বা দেশবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিক্ষার্থী।

বেকারত্বই তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ

ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। কিন্তু শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতে বেকারত্ব তরুণদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে বেকারত্বের হার এখনো ৫ শতাংশের কিছু বেশি। তবে গত বছর রয়টার্সের একটি জরিপে বলা হয়, এই সামগ্রিক হার তরুণদের কর্মসংস্থানের বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি তুলে ধরে না।

২০২৫ সালে ভারতের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৩৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। আর ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের প্রতি পাঁচজনের প্রায় একজন বেকার।

চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বাতিল করার পর দেশজুড়ে অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু তরুণের কাছে এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

দিল্লির ৩০ বছর বয়সী সমাজকর্মী রুবি সিং বলেন, বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে যে বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও তাঁরা সুযোগ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, এই প্রজন্ম মানসম্মত শিক্ষার অভাবে ভুগছে। ফলে ভালো সুযোগ পাওয়ার পথও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের নির্বাচনেও পড়তে পারে প্রভাব

ভারতের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হতে এখনো প্রায় তিন বছর বাকি। তবে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে আগামী বছরের শুরুর দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচন মোদীর জনপ্রিয়তা এবং বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে বর্তমান বিক্ষোভ ভবিষ্যৎ নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন না বিশ্লেষকেরা।

নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল ভার্মা বলেন, কয়েক মাস আগের তুলনায় বিজেপি হয়তো এখন ততটা শক্তিশালী অবস্থানে নেই। তবে এর ফলে নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।

সূত্র: রয়টার্স

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD