Logo

কারও ঘুম আসে মুহূর্তে, আবার কারও লাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা —কেন?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২ নভেম্বর, ২০২৬, ২১:৩৯
কারও ঘুম আসে মুহূর্তে, আবার কারও লাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা —কেন?
ছবি: সংগৃহীত

বিছানায় শোয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই কেউ ঘুমিয়ে পড়েন। আবার কারও ঘুম আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। রাতভর এপাশ-ওপাশ করেও ঘুমের দেখা পান না অনেকে। মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার সময়ের এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক অবস্থা, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ির প্রভাব।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সবসময় সুস্থতার লক্ষণ নয়। বরং নিয়মিত খুব অল্প সময়ে ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা শরীরে ঘুমের ঘাটতি বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

ঘুম আসতে কতক্ষণ লাগা স্বাভাবিক?

বিজ্ঞাপন

সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ঘুমিয়ে পড়তে ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঘুমাতে যাওয়ার পর ঘুম আসতে যে সময় লাগে, তাকে বলা হয় ‘স্লিপ ল্যাটেন্সি’ (Sleep Latency)।

ঘুমের সময়ের ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন:

- ১০ থেকে ২০ মিনিট: অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য স্বাভাবিক সময়।

বিজ্ঞাপন

- ৫ মিনিটের কম: নিয়মিত এমন হলে ঘুমের ঘাটতি বা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার ইঙ্গিত হতে পারে।

- ৩০ মিনিটের বেশি: নিয়মিত এমন হলে অনিদ্রা বা অন্য কোনো ঘুমজনিত সমস্যার সম্ভাবনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০২৩ সালে ‘স্লিপ মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ১১০টি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দলের ওপর দিনের বেলায় ঘুমানোর পরীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ঘুমানোর চেষ্টা করার পর গড়ে প্রায় ১২ মিনিটে ঘুম আসে। গবেষকদের মতে, খুব কম সময়ে ঘুমিয়ে পড়া দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কেন কেউ কয়েক মিনিটেই ঘুমিয়ে পড়েন?

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার পেছনে একাধিক শারীরিক ও মানসিক কারণ কাজ করে।

ঘুমের তীব্র চাপ: দীর্ঘ সময় জেগে থাকলে মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন (Adenosine) নামের রাসায়নিক পদার্থ জমতে থাকে। এর প্রভাবে ঘুমের তাগিদ বাড়ে। ফলে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকার পর বিছানায় গেলে দ্রুত ঘুম আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ঘুমের ঘাটতি: নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ঘুমের চাপ তৈরি হয়। এ কারণে বিছানায় যাওয়ার পর দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রম: সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম কিংবা ব্যায়ামের কারণে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এতে ঘুম আসার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

মানসিক প্রশান্তি: দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কম থাকলে মস্তিষ্ক সহজে বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে। ফলে ঘুম আসতে সময় কম লাগে।

বিজ্ঞাপন

নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাস শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত করে তোলে।

বয়স ও বংশগত বৈশিষ্ট্য: মানুষের ঘুমের ধরনে বয়স ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব রয়েছে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া কি সবসময় ভালো?

বিজ্ঞাপন

না। বিশেষ করে প্রতিরাতে এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া এবং দিনের বেলায় বারবার ঝিমুনি আসাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।

কাজের মধ্যে, কথা বলার সময় কিংবা অন্য কোনো সক্রিয় অবস্থায় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnoea) বা নারকোলেপসি (Narcolepsy)-এর মতো ঘুমজনিত সমস্যার সঙ্গেও অতিরিক্ত দিনের ঘুমের সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কেন অনেকের ঘুম আসতে দেরি হয়?

বিজ্ঞাপন

ঘুমাতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা। উদ্বেগের কারণে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এসব হরমোন মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে, ফলে শরীর ক্লান্ত থাকলেও সহজে ঘুম আসে না।

২০২২ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রি’ (Frontiers in Psychiatry) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনাও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অর্থাৎ শুধু দুশ্চিন্তা নয়, আনন্দদায়ক বা উত্তেজনাপূর্ণ চিন্তাও মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় জাগিয়ে রাখতে পারে।

ঘুম আসতে দেরি হওয়ার আরও কিছু কারণ

বিজ্ঞাপন

- জৈবিক ঘড়ির অসামঞ্জস্য: যারা স্বাভাবিকভাবেই রাতে দেরিতে ঘুমাতে অভ্যস্ত, তাদের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে।

- ক্যাফেইন গ্রহণ: চা, কফি ও অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় অ্যাডেনোসিনের কার্যকারিতায় বাধা দেয়। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক তাগিদ কম অনুভূত হয়।

- অনিয়মিত রুটিন: ছুটির দিনে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা কিংবা পালাক্রমে কাজ করার কারণে শরীরের ঘুম-জাগরণের ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

- দীর্ঘ সময় দিনের ঘুম: দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে রাতে ঘুমের চাপ কমে যায়।

- ভারী খাবার, অ্যালকোহল ও নিকোটিন: রাতে ভারী খাবার অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। অ্যালকোহল প্রথমে ঘুমঘুম ভাব আনলেও পরবর্তী সময়ে ঘুমের স্বাভাবিক মান নষ্ট করে।

- অস্বস্তিকর পরিবেশ: শোবার ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ কিংবা অনুপযুক্ত তাপমাত্রা ঘুমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

- ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা: ঘুম আসছে না—এমন চিন্তা ও বারবার সময় দেখার অভ্যাস মানসিক চাপ বাড়িয়ে ঘুম আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

কোন কোন শারীরিক সমস্যা ঘুমে বাধা দেয়?

বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে ঘুমাতে অসুবিধা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

- উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।

- স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম।

- দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথা।

- থাইরয়েড গ্রন্থির অতিরিক্ত সক্রিয়তা।

- অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুক জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা।

- পেরিমেনোপজ ও গর্ভাবস্থার মতো সময়ে হরমোনের পরিবর্তন।

- নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড ও নাক বন্ধ কমানোর ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

সহজে ঘুমিয়ে পড়তে কী করবেন?

ঘুমের সমস্যা কমাতে দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন—

  • প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠুন। ছুটির দিনেও এই সময়সূচি বজায় রাখার চেষ্টা করুন।

  • সকালে সূর্যের আলোতে কিছু সময় কাটান এবং দিনের বেলায় নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।

  • ঘুমানোর অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করুন।

  • শোয়ার ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ঘরের আলো কমিয়ে দিন। মোবাইল, কম্পিউটার ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে দূরে থাকুন।

  • শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখুন। ঘুমের আগে উষ্ণ পানিতে গোসল, বই পড়া কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

  • সন্ধ্যার দিকে নিজের দুশ্চিন্তা ও পরবর্তী দিনের কাজগুলো লিখে রাখুন। এতে বিছানায় শুয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার প্রবণতা কমতে পারে।

  • রাতে ভারী খাবার ও অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।

  • বিছানাকে মূলত ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করুন।

  • বিছানায় যাওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পরও ঘুম না এলে উঠে মৃদু আলোতে শান্ত কোনো কাজ করুন। ঘুমের ভাব এলে আবার বিছানায় ফিরে যান।

  • বারবার ঘড়ির দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকুন। এতে ঘুম না আসার দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে পারে।

  • সব মিলিয়ে, দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া কিংবা ঘুম আসতে দেরি হওয়া—কোনোটিই এককভাবে সুস্বাস্থ্যের মাপকাঠি নয়। নিয়মিত ঘুমের সময়, ঘুমের মান এবং দিনের বেলায় শরীর কতটা সতেজ থাকছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

    জেবি/এসডি

    জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

    Developed by: AB Infotech LTD