বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল

বিচার বিভাগের কাঠামোগত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে জাতীয় সংসদে পৃথক দুটি বিল পাস হয়েছে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য প্রণীত বিশেষ বিধান এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের উদ্যোগ আর বহাল থাকছে না। বিরোধীদলের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) কণ্ঠভোটে বিল দুটি অনুমোদিত হয়।
বিজ্ঞাপন
সংসদে পাস হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’-এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংশ্লিষ্ট তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হচ্ছে। এর ফলে বিচার বিভাগ আগের কাঠামোয় ফিরে যাবে এবং বিচারক নিয়োগে আলাদা কোনো আইন কার্যকর থাকবে না।
তবে অধ্যাদেশের আওতায় ইতোমধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বহাল রাখা হয়েছে। বিশেষ করে এ ব্যবস্থার অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত ২৫ জন বিচারকের নিয়োগ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ওই সচিবালয়ের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যাবে। এর অধীনে চলমান বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য কার্যক্রম আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে স্থানান্তর করা হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃষ্ট পদগুলো বাতিল করা হবে এবং সেখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের চাকরি পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে বিল দুটি আইনে পরিণত হবে এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা কার্যকর হবে।
বিরোধীদল বিল দুটির বিরোধিতা করে এটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় আনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাবও উত্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, অতীতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলির মতো ঘটনা ঘটেছে—নতুন ব্যবস্থায় সেই পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আগে সমর্থিত একটি কাঠামো হঠাৎ বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সমালোচনার জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার মতে, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কিনা তা নির্ধারণ করতে পারে, তবে আইন প্রণয়নের বিষয়ে সংসদের ওপর নির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের নেই।
তিনি আরও বলেন, অতীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং এ কারণে ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও সংসদে বিস্তর আলোচনা হয়। বিরোধী দলের সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বিচারপতি নিয়োগ দেন, যা প্রভাবমুক্ত নয়। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থাকে তুলনামূলক স্বচ্ছ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগের বিষয়টি নির্ধারিত থাকলেও ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার বিচারক নিয়োগে পৃথক কাউন্সিল গঠন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সেই সচিবালয় অধস্তন আদালতের তদারকি, বদলি, পদায়ন এবং শৃঙ্খলা সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করত।
তবে নতুন করে সংসদে বিল পাস হওয়ায় ওই সব উদ্যোগ আর কার্যকর থাকছে না। কণ্ঠভোটে বিরোধীদের আপত্তি নাকচ হওয়ার মাধ্যমে বিল দুটি অনুমোদন পায়।
অধিবেশন শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষণ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।






