Logo

আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই রূপপুরের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪:৩৯
আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই রূপপুরের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্প দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন রয়েছে উচ্ছ্বাস, তেমনি রয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কও।

বিজ্ঞাপন

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদুল হাসান জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রটির প্রথম রিয়্যাক্টর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটটি এর এক বছরের মধ্যে কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের সময়ে এই বিদ্যুৎ দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে জানান তিনি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে এক সময়ের নীরব এলাকাটি এখন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের কারণে এলাকায় রুশ সংস্কৃতিরও প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও রুশ ভাষার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় খাবারের সঙ্গে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বর্শ’ স্যুপও।

বিজ্ঞাপন

বদলে গেছে স্থানীয় অর্থনীতি

রূপপুর প্রকল্পের কারণে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য।

২৮ বছর বয়সী মো. ইমন খান ঢাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে নিজের এলাকা রূপপুরে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের কাছে ফল ও শাকসবজি বিক্রি করেন।

বিজ্ঞাপন

ইমন খান বলেন, ‘আমি সামান্য রুশ ভাষা বলতে পারি, আর তারাও কিছুটা বাংলা বলতে পারে।’

রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত রুশ ইন্সটলেশন টেকনিশিয়ান আলেকজান্দার ভ্লাদিমিরোভিচ স্কভোর্তসোভ জানান, তার সামনে তুরস্ক অথবা বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি রূপপুরকে বেছে নেন এবং ২০২৪ সালে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আসেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন প্রথম রূপপুরের নির্মাণকাজটি দেখেছিলাম, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে এই প্রকল্পে অনেক কাজ বাকি আছে। সত্যি বলতে, রূপপুর আমার জীবন ও চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন স্বপ্ন। ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাফিজ বলেন, ‘আমাদের এলাকা পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে এতে আমরা আনন্দিত। আমার বন্ধুরা এবং আমি আশা করি প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে এই কেন্দ্রেই কাজ করতে পারব।’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

তবে রূপপুর প্রকল্প নিয়ে সবাই এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার দূরত্বে বসবাসকারী ৮০ বছর বয়সী সাবেক কাগজকল শ্রমিক মো. ইউনুস আলী দীর্ঘদিন ধরেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে তারা বিকট শব্দে একটি কম্প্রেসার পরীক্ষা করেছিল। ঘুমিয়ে থাকা শিশুরাও ভয়ে জেগে উঠেছিল। আমি এখন বৃদ্ধ, আমার নিজের জীবনের ভয় নেই। কিন্তু আমার সন্তান ও নাতি-নাতনি রয়েছে, আমি তাদের নিরাপত্তা চাই।’

তবে রূপপুর কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক সব নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো প্রকল্পটিতে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

আতঙ্ক ও বিতর্কের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের বড় প্রত্যাশা এখন বিদ্যুৎ সরবরাহকে ঘিরে। তারা জানতে চাইছেন, রূপপুর থেকে কবে নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

৫৫ বছর বয়সী কৃষক বেলী বেগম বলেন, ‘আমি চাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দ্রুত চালু হোক এবং আমরা যেন এর পূর্ণ সুবিধা পাই। আমার ঘরের কাছেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাই আশা করি আমরা ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাব।’

দীর্ঘ অপেক্ষার পর নির্মাণ

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম নেওয়া হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। এরপর বিভিন্ন সরকারের সময়ে ফ্রান্স, সৌদি আরব, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে ২০১৫ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৭ সালে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

তবে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং সরঞ্জাম পরিবহনে জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ কয়েক দফা পিছিয়ে যায়।

এ ছাড়া রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে রূপপুরে এখন একই সঙ্গে রয়েছে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। প্রকল্পটি চালু হলে এসব প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বাংলাদেশ।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD