হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ১৬ বছর ধরে ছেলেকে শিকলে বেঁধে রেখেছেন মা

বসতঘরের পাশের একটি আমগাছের নিচে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দিন কাটছে ২০ বছর বয়সী ইমরানের। শৈশব থেকেই মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে সে। মাত্র চার বছর বয়স থেকে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তার মা শাহিনুর বেগম। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে শিকলবন্দি জীবন কাটছে ইমরানের। অথচ এই তরুণের জীবনেও হয়তো ফিরতে পারত স্বাভাবিকতার আলো, যদি মিলত যথাযথ চিকিৎসা ও একটু সহমর্মিতা।
বিজ্ঞাপন
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার রামপুর গ্রামের একটি ভাঙাচোরা ঝুপড়িঘরে বসবাস ইমরান ও তার অসহায় মায়ের। অভাবের সংসারে একদিকে ছেলের চিকিৎসার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে নিজের অসুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই সব মিলিয়ে দিশেহারা শাহিনুর বেগম। অর্থাভাবে ঠিকমতো খাবার জোটে না, চিকিৎসা তো অনেক দূরের কথা।
ইমরান ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছে। তাকে হারিয়ে ফেলা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কায় মা তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। এভাবেই কেটে গেছে তার শৈশব, কৈশোর; এখন যৌবনেও মুক্ত জীবনের স্বাদ থেকে বঞ্চিত সে। ঘুম, খাওয়া ও গোসলসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজই কাটছে শিকলবন্দি অবস্থায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ইমরানের বাবা ইসহাক জিহাদী পাঁচ বছর আগে মির্জাগঞ্জ মাজার মসজিদে জুমার নামাজ আদায়রত অবস্থায় মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই ছেলেকে নিয়ে আরও অসহায় হয়ে পড়েন শাহিনুর বেগম। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় দুবেলা খাবার জোগাড় করাই এখন তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো খাবার জোটে, কখনো কাটে অনাহারে। ছেলেকে সুস্থ করে তোলার স্বপ্ন দেখেন মা শাহিনুর বেগম। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দারিদ্র্য। ইমরানের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন বলে জানান তিনি। একসময় কষ্ট করে ওষুধ কেনার চেষ্টা করলেও বর্তমানে অর্থের অভাবে বন্ধ রয়েছে তার চিকিৎসা। চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইমরানের অস্বাভাবিক আচরণ আরও বেড়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
অন্যদিকে, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন শাহিনুর বেগমও। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজেও চিকিৎসাহীনতায় ভুগছেন। নিজের শরীরের কষ্ট উপেক্ষা করে ছেলেকে আগলে রাখছেন তিনি। কিন্তু যে মায়ের নিজেরই দুমুঠো খাবার জোগাড় করা কঠিন, সেই মায়ের পক্ষে অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কীভাবে সম্ভব?
ভাঙাচোরা ঘর, অনিশ্চিত খাবার, চিকিৎসাহীনতা আর পায়ে শিকল এই চার দেয়ালের বাইরেও যেন ইমরানের জন্য অপেক্ষা করছে না কোনো আশার আলো। যে বয়সে অন্য তরুণদের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সে ইমরানের দিন কাটছে গাছের নিচে বন্দিদশায়। আর পাশে বসে অসহায় চোখে সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখছেন তার মা।
বিজ্ঞাপন
মানসিক অসুস্থতা কোনো অপরাধ নয়। প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ, সহমর্মিতা ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ। ইমরানের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা জরুরি।
স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ইমরানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো তার জীবনে ফিরতে পারে নতুন সম্ভাবনা। পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারটির খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
শাহিনুর বেগমের চোখে আজ একটাই প্রশ্ন অর্থের অভাবে কি তার সন্তানের বাকি জীবনও শিকলবন্দি অবস্থায় কাটবে? কেউ কি এগিয়ে আসবেন অসহায় এই মা ও ছেলের পাশে? নাকি অভাব আর চিকিৎসাহীনতার অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে ইমরানের জীবনের বাকি দিনগুলো?
বিজ্ঞাপন
অসহায় ইমরানকে সহযোগিতার জন্য তার মায়ের বিকাশ ও নগদ নম্বর -01927420159








