এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি মরদেহগুলোর পরিচয়, কর্তৃপক্ষের খোঁজ নেই

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পাশাপাশি নিখোঁজ রয়েছেন আরও ছয়জন। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় অবস্থিত রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুনে রেস্তোরাঁ ও আবাসিক স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে কোন মরদেহটি কার, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আহত সাতজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন ঢাকার পশ্চিম রামপুরার শিহাব সাদি (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা (২৯), মিরপুরের শিয়ালপাড়ার আবদুল মান্নান (৩৫) ও তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা (৩২), উত্তরার মুহাম্মদ মাসুদ (৩৩) ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেসা রোমি (৩০) এবং আশিক (২৮)। তাঁরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
নিখোঁজ ছয়জনের সন্ধানে অভিযান
অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ থাকা ছয়জন হলেন ফারিয়া কবির (৩৩), নাফিস ইবতে হামিদ (২৪), ফাইজান (৫), মিথিলা মেহজাবিন (২৩), লাইলা জাহান নাবিলা (২৪) ও মালিহা (২৮)। তাঁদের সন্ধানে উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার স্টেশন ইনচার্জ দোলন আচার্য্য জানান, ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় নিহতদের পরিচয়, আগুনের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, নিহত সবাই পর্যটক কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টে কর্মচারীরাও অবস্থান করতেন। ফলে নিহতদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কর্মী থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষে হতাহতের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, দুর্ঘটনার সময় রিসোর্টটিতে ১৭ থেকে ১৮ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট মিলিয়ে সেখানে ১২ থেকে ১৪ জন কর্মচারী কাজ করতেন এবং তাঁদের কেউ কেউ সেখানেই থাকতেন।
আবাসিক সেবা চালু থাকলেও ছিল না প্রয়োজনীয় অনুমোদন
বিজ্ঞাপন
জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহাব উদ্দিন জানান, পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত রেস্তোরাঁটি চট্টগ্রামের আমিরাবাদের নিয়াজ মোহাম্মদ ও বোয়ালখালীর তানভীর আহমেদ যৌথভাবে ২০ শতক জমি কিনে গড়ে তোলেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হলেও আবাসিক রিসোর্ট হিসেবে পরিচালনার অনুমতি কিংবা আলাদা ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়নি। রেস্তোরাঁর পাশে চারটি কক্ষ তৈরি করে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একটি পরিবার বা দল মিলে এসব কক্ষে ১২ থেকে ১৬ জন পর্যন্ত থাকতে পারতেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল ৮টা থেকে একাধিক ইউনিট কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর ভবনটির ভেতরে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে খুঁজছে পুলিশ
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে কতজন পর্যটক এবং কতজন কর্মচারী, তা নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে পাওয়া যাচ্ছে না।
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে আগুনের সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নেজারত শাখার তথ্য অনুযায়ী, টুপটুপ রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অননুমোদিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছিল।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানও জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে ওঠায় প্রশাসন থেকে আগে উদ্যোগ নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়নি। এখন মালিকদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘আমার সাইফকে আইন্না দাও’—স্বজনের আহাজারি
বিজ্ঞাপন
অগ্নিকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এক নারীকে স্বজনের খোঁজে আহাজারি করতে দেখা গেছে। ভিডিওতে তাঁকে বারবার বলতে শোনা যায়, ‘আমার সাইফকে আইন্না দাও।’
ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণে এসেছিলেন। তবে সাইফ তাঁর কী সম্পর্কের এবং তিনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কি না, কিংবা তাঁর সর্বশেষ অবস্থা কী—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তির নিখোঁজ থাকার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। উদ্ধার অভিযান, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান শনাক্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ চিত্র সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।








