ভোলার চরে ক্যাপসিকাম বিপ্লব

আধুনিক নগর সভ্যতায় ব্যাস্ত নাগরিক জীবনে তরুন প্রজন্ম ও ভোজন রসিক সকলের নিকট আড্ডা ও গল্পের কেন্দ্রবিন্দু চাইনিজ রেস্ট্রুরেন্ট। আর চাইনিজ রেস্ট্রুরেন্ট বিভিন্ন মেন্যুতে ক্যাপসিকাম ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। অনেকের নিকট রন্ধন শিল্পে সালাদ, নুডুলস বা চায়নিজ খাবার তৈরিতে ক্যাপসিকাম এখন বাঙ্গালির খাবারের তালিকার অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। এতে করে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়।তাই বাজারে দেশীয় সবজির পাশাপাশি বিদেশি সবজি ক্যাপসিকামের বিক্রিও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
মরিচ বা মসলা জাতীয় এই ক্যাপসিকাম দেশীয় কোন ফসল না হলেও গত কয়েক বছরে ক্যাপসিকামের উৎপাদন তিন গুনেরও বেশি, পাশাপাশি এর চাহিদাও বেড়েছে বেশ। বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের ৫৫% ক্যাপসিকাম আবাদ হয় ভোলায় তার মধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি হয়। এ বছর প্রায় ১০৫ হেক্টর জমিতে ক্যাপসিকাম আবাদ হয়েছে। ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের গাজীপুর চরে ৫০ হেক্টর, কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চরে ২৯ হেক্টর, রাজাপুর ইউনিয়নের কানী বগার চর ও ভোলার চরে ২৬ হেক্টর জমিতে ক্যাপসিকাম আবাদ হয়েছে।
ভোলাতে জেগে উঠা স্থায়ী চরগুলোতে মূলত ক্যাপসিকামের আবাদ হয়। এ চরগুলোতে বর্ষার সময় জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। ফলে এ চর গুলোতে পলি পড়ে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। বর্ষার সময় এখানের কিছু জমিতে ধান হয়। বেশিরভাগ জমিতেই ধৈঞ্চার আবাদ হয়। এ ধৈঞ্চা পরবর্তীতে মাটিতে মিশিয়ে জৈব পদার্থের পরিমান বাড়ানো হয়।
বিজ্ঞাপন
অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দিকে মূল ভূখণ্ডে ক্যাপসিকামের চারা করা হয়। কৃষকেরা সাধারনত এসিআই সীড কোম্পানির আস্থা, ইন্ডিয়ান আশা, এ আর মালিক সীডসের গ্রীন বল, ব্রাক সীডসের গ্রীন ক্যাপ, ইস্পাহানী এগ্রো লিমিটেড সবুজ পরী, লাল তীর সীড লিমিটেডের সুইট বিউটি, সিনজেন্টার ইন্দা বীজ ব্যবহার করে। পাশাপাশি ভারত থেকেও কিছু বীজ আমদানী করে ক্যাপসিকামের আবাদ করা হয়।
প্রতি শতকের জন্য ১-২ গ্রাম বীজ দরকার হয়। বীজ গজাতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। বীজ বপনের ৭-১০ দিন পর চারা ৩-৪ পাতা বিশিষ্ট হলে পলি ব্যাগে স্থানান্তর করা হয়। সাধারনত ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা মূল জমিতে লাগানো হয়। রোপনের ৫০-৫৫ দিনের মধ্যে ফল ধরা শুরু হয়। ক্যাপসিকামের চারা সাধারনত নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে মূল জমিতে লাগানো হয়। সাধারণত সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। অধিকাংশ গাছে একবারে প্রায় ৪ থেকে ৫টি ক্যাপসিকাম আসে। ক্যাপসিকাম চাষ রোগ-বালাই এর প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশী সংবেদনশীল হওয়ায় নিয়মিত যত্ন করতে হয়।
একবার গাছ ভালো করে বিকশিত হয়ে গেলে প্রথম যখন ফল আসবে তখন তা সংগ্রহ না করাই ভালো কারন এতে গাছ দৃঢ় হয়। সাধারণত দ্বিতীয়বার থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়। ফল সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে সামান্য পরিমাণে বোটা রেখে দিতে হয়। ফল সংগ্রহের পর ঠান্ডা অথচ ছায়াযুক্ত স্থানে বাজারজাতকরণের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। এ সময়ে ৮-১২ বার পর্যন্ত ফলন সংগ্রহ করা হয়। ক্যাপসিকাম সংগ্রহ করে পাশাপাশি কয়েকজন কৃষক মিলে ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে ঢাকা পাঠানো হয়। ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজরে পাইকারি দরে ক্যাপসিকাম বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে সারাদেশের ক্যাপসিকাম ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যায়। মৌসুমের শুরুতে প্রতিকেজি ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করলেও ভরা মৌসুমে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ফলনের শেষের দিকে ৪০-৫০ টাকা দরে ও বিক্রি হয়।
বিজ্ঞাপন
নদীর পলি পড়া, সবুজ সারের ব্যবহার এবং নিয়মিত সার ব্যবহারের ফলে প্রতি হেক্টর জমিতে ৩০-৩৫ টন পর্যন্ত ফলন হয়। উত্তোলন শেষে প্যাকেটজাত বস্তায় করে নদীপথে সহজেই ঢাকায় পাইকারী দরে বিক্রি হওয়ায় আর্থিকভাবে কৃষকেরা বেশ লাভবান হন। ক্যাপসিকাম চাষ করে কৃষকেরা প্রতি হেক্টরে সাধারনত ১৪-১৮ লাখ টাকা আয় করেন। তবে ক্যাপসিকাম চাষ বেশ ব্যয় ও কষ্টসাধ্য। এ ফসল আবাদকারী কৃষকেরা সাধারনত মৌসুমজুড়ে মাঠেই পড়ে থাকেন। এ সময়ে বড় দুচিন্তার কারন হলো অতি জোয়ারের পানি। মাঝে মাঝে পানি উঠে ক্যাপসিকাম গাছ মারা যায়। পাশাপাশি সারসহ কৃষিজ উপকরন চরে পরিবহন বেশ সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ক্যাপসিকাম চাষ বেশ লাভজনক হওয়ায় দিন দিন ক্যাপসিকাম আবাদ বেড়েছে।
ভোলায় সাধারনত সবুজ রংয়ের ক্যাপসিকাম আবাদ হয় কারন সবুজ রংয়ের ক্যাপসিকামের দাম কম হলেও এর shelf life এবং ফলন তুলনামূলক অনেক বেশী। পাশাপাশি পরিবহনকালীন অপচয় কিংবা নষ্ট কম হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত কৃষকদের প্রশিক্ষন, উঠোন বৈঠকসহ কারিগরী সহযোগীতা প্রদান করা হয়। এতে করে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা হয়, রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হয় এবং ফলন বেশি হয়। আর এই সবুজ সোনা চাষে অনেকে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে উন্নত জীবন-যাপন করছেন।
বিজ্ঞাপন








