ঋণের চাপে দিশেহারা কৃষক, ঘরবাড়ি ছাড়ছেন অনেকেই

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে কৃষকদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি। হাওরের বিস্তীর্ণ জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। অনেকেই পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র কাজের সন্ধানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
বুধবার ( ১৩ মে) দুপুরে উপজেলার টগার হাওরের শুনুই এলাকায় সড়কের পাশে কিছু ধান শুকাচ্ছিলেন কৃষক আকবর আলী। কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এবার প্রায় আট একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু এক কাটা জমির ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। টগার হাওরের সব জমিই পানির নিচে চলে গেছে।
আকবর আলী বলেন, জমি চাষের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পাশের সেলবরষ ইউনিয়নের বজলু মিয়ার কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার, নিজ গ্রামের সাহিদ আলীর কাছ থেকে ১ লাখ এবং ইসলামপুরের ইয়াছিন মিয়ার কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা ধার করে চাষাবাদ করেছিলেন। এছাড়া আগে এক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় চিকিৎসার খরচও তার ওপর বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “ধান হলে ছয়-সাতশ মণ ধান পেতাম। ঋণ শোধ করতে সমস্যা হতো না। কিন্তু সব ধান পানির নিচে চলে গেছে। এখন মনে হচ্ছে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে।”
সড়কের পাশে যে ধান শুকাচ্ছিলেন, সেটিও নিজের নয় বলে জানান তিনি। বলেন, “আমার কোনো ধানই কাটতে পারিনি। যেগুলো শুকাচ্ছি, সেগুলো অন্য একজনের। এখন অবসর আছি, তাই অন্যদের কাজে সাহায্য করছি।”
কথা বলতে বলতেই চোখ ভিজে আসে আকবর আলীর। তিনি বলেন, “আজও এক পাওনাদার এসে গালিগালাজ করে গেছে। তাকে ১ লাখ টাকার বিপরীতে ২৫ মণ লাভের ধান আর নগদ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। আমি বলেছি, বাঁচলে টাকা পাবেন। কিন্তু সে রাগ করে চলে গেছে।”
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, বেঁচে থাকার তাগিদে পরিবার নিয়ে ঢাকা অথবা রাঙামাটিতে কাজের সন্ধানে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তার পাঁচ সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ত, তাকেও পড়াশোনা ছাড়িয়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে তাহমিদার লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্য দুই সন্তান মাদ্রাসায় পড়ে এবং ছোট ছেলে শিশু শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। তাদের মায়ের কাছে রেখে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
একই ধরনের দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন পাশের বেকুইজোড়া গ্রামের কৃষক সাহেব আলীও। তিনি বলেন, প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ করে জমিতে ধান করেছিলেন। কিন্তু অর্ধেক জমির ধানও কাটতে পারেননি। যে সামান্য ধান পেয়েছেন, তা দিয়ে ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এখন সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে সারা বছর কীভাবে চলবেন, সেই চিন্তায় আছেন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় শিক্ষক আব্দুস সালাম চৌধুরী বলেন, নিচু এলাকার অনেক কৃষক এবার ঋণের চাপে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন। তার ভাষায়, এক একর জমিতে চাষ করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেক বর্গাচাষী আট থেকে দশ একর জমি আবাদ করেছেন। ফলে তাদের ঋণের পরিমাণও বেশি। অন্তত ২০ জন বর্গাচাষী এবার মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও বিভিন্ন বেসরকারি ঋণদান সংস্থার কর্মীরা কিস্তি আদায়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। কৃষকেরা এখন কী খেয়ে বাঁচবেন, ঋণ কীভাবে শোধ করবেন—তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
জমিলা নামের এক কৃষাণী জানান, বৃহস্পতিবার সকালেও একটি এনজিওর কর্মী কিস্তির টাকা নিতে তাদের বাড়িতে যান। তিনি বলেন, “সব ধান পানির নিচে চলে গেছে, ঘরে টাকা নেই বলার পরও তারা বলেছে, ধান না পেলেও কিস্তি দিতে হবে।”
বিজ্ঞাপন
কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, নিচু এলাকার কৃষকদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। যারা শুধুমাত্র হাওরের নিচু জমিতে চাষ করেছেন, তাদের অনেকের সামনে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সুদের টাকার চাপে তারা টিকে থাকতে পারছেন না।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আশয়াদ বিন খলিল রাহাত জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেবে বলে জানান তিনি।








