টানা তিন মাস পর উন্মুক্ত হচ্ছে সুন্দরবন
জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২:১৪ পিএম, ৩১শে আগস্ট ২০২৫

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও খুলছে সুন্দরবনের প্রবেশ দ্বার। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে সুন্দরবনে উন্মুক্ত হচ্ছে পর্যটক, বাওয়ালি, জেলে ও মৌয়ালদের প্রবেশ অধিকার।
সোমবার থেকে সুন্দরবনের দ্বার খোলায় উপকূলে জেলের ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার বয়ছে। স্ত্রী সন্তান পরিবার নিয়ে উৎসবে মেতেছে। উপকূলের এই সময়টা উৎসব মুখর পরিবেশ চলে। সুন্দরবনের দ্বার খোলায় জেলে বাওয়ালদের মুখে আনন্দের হাসি ফুটেছে।
বন বিভাগের তথ্য মতে, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে (১ সেপ্টেম্বর) থেকে খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। জেলে, বাওয়ালিরা স্ব স্ব স্টেশন থেকে পাস-পারমিট নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে। একইসঙ্গে পর্যটকরাও এদিন থেকে সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবেন।
সুন্দরবনের জল ভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এ কারণে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশে সুন্দরবনে সবার প্রবেশের অনুমতি বন্ধ রেখেছিল বন মন্ত্রণালয়। তিন মাসের জন্য জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। আজ থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা এলাকার জেলে আল মামুন মালী ও হানিফ গাজী বলেন, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ফের সুন্দরবনে মাছ ধরা যাবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা পাস-পারমিট নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করব ইনশাআল্লাহ।
গাবুরা ট্রলার (বোট) শ্রমিকের সভাপতি কালাম মালী বলেন, পর্যটকের ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলে। সুন্দরবনে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পর্যটক ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় তাদের প্রায় এক হাজার ট্রলারচালক ও শ্রমিক বেকার জীবনযাপন করেন। তাদের সংসার চলে খুব কষ্টে ধার দেনা করে।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের জেলে আব্দুল হাকিম জানান, বছরের প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকে। মৎস্য বিভাগ প্রতিবছর মাছের প্রজনন মৌসুমে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রাখে। এই অবসরকালে সাগরে মাছ ধরা জেলেদের মাথাপিছু ৮৬ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন।
মুন্সীগঞ্জ ট্রলার (বোট) মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আনিছুর রহমান জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনের দ্বার খুলে দেওয়া হলেও তাতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের তেমন একটি লাভ হবে না কারণ এখন পর্যটনের অফ সিজন। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটনের মৌসুম। তিন মাস পর্যটন বন্ধ থাকায় তাদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ধার দেনা ও ব্যাংকের ঋণ করে বেকার হয়ে পড়েছে দেড় সহস্রাধিক পর্যটন শ্রমিক।
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, জেলে, বাউয়াল ও মৌয়ালরা জীবন-জীবিকা নির্বাহে সুন্দরবনের প্রবেশের জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে। ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে জেলে ও ট্রলার শ্রমিকদের বিএলসি লাইসেন্স সার্টিফিকেট হয়েছে ২ হাজার ৯৭০টি।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ফরেস্ট রেঞ্জার কর্মকর্তা মো: ফজলুল হক বলেন, আজ থেকে জেলে ও বাওয়ালিদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেওয়া হবে। এ জন্য আগে থেকে জেলে বাওয়ালির পাশাপাশি পর্যটক পরিবহনকারী ট্রলার মালিকরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, বনের প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা, বন্যপ্রাণী এবং নদী-খালের মাছের বিচরণ ও প্রজনন কার্যক্রমের সুরক্ষায় প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে সকল ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ায় আজ থেকে বনজীবী ও টুরিস্টরা নিয়ম মেনে অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন। আমরা বনজীবী ও টুরিস্টদের সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত।
এসএ/