উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনায় বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে আশঙ্কা

আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে আবারও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। বাজেটে শুল্ক-কর কাঠামোর পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলে, তা অনেকেই বিশদভাবে না জানলেও একটি ধারণা প্রায় সবার মধ্যেই কাজ করে— বাজেট এলেই বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এবার সেই দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর দ্বিগুণ করার সম্ভাব্য সরকারি উদ্যোগ।
বিজ্ঞাপন
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর বর্তমান দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হতে পারে নতুন বাজেটে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রায় ২৮ ধরনের কৃষিপণ্য এর আওতায় পড়বে। ফলে চাল, ডাল, আটা, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর রামপুরা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মী মুন্নুজান বেগম বলেন, এমনিতেই বাজারে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে উৎসে কর বাড়ানো হলে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।
আরও পড়ুন: টানা ৩ দফা কমার পর বাড়ল সোনার দাম
বিজ্ঞাপন
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাজীপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক মাসুদ মিয়া। যদিও উৎসে করের বিষয়টি সম্পর্কে তার বিস্তারিত ধারণা নেই, তবু তিনি মনে করেন বাজেটের পর জীবনযাত্রার ব্যয় আবারও বাড়বে। তিনি বলেন, যাত্রীদের মুখে শুনছেন চাল, আটা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, যা তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎসে করের বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে। কারণ করের টাকা একবার সরকারকে পরিশোধ করার পর বাস্তবে তা ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। ফলে কোম্পানিগুলো এটিকে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে ধরে পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে নেয়। এর প্রভাব পড়ে বাজারদরে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা উচিত। তাদের যুক্তি, কৃষক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের বড় অংশই কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় বাস্তবে এ কর আদায় জটিল হয়ে পড়ে। অথচ এর প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
বিজ্ঞাপন
চলতি অর্থবছরে সরকার কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনে। এর আগের বছরেও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছিল। তবে এবার আবার তা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বাজারে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, খুচরা বাজার থেকে নগদে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উৎসে কর কার্যকরভাবে কাটা সম্ভব হয় না। কারণ অধিকাংশ কৃষক ও বিক্রেতার টিআইএন নম্বর নেই। তার মতে, এই কর বাড়ানো হলে শুধু বাসাবাড়ির খাবারের খরচ নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের দামও বাড়বে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কৃষিভিত্তিক শিল্পখাত ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে কর বাড়ানো হলে শিল্পখাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং পণ্যের দাম আরও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত কয়েক বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, শহরের পরিবারগুলোর আয় কমলেও ব্যয় বেড়েছে। একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশই এখন খাদ্য কেনার পেছনে চলে যাচ্ছে।
শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিরাও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম বলেন, নিম্নআয়ের মানুষ অল্প টাকায় রুটি, কেকসহ সহজলভ্য খাবার কিনে দিন কাটান। এসব খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিজ্ঞাপন
কলাম লেখক শাহানা হুদা রঞ্জনা মনে করেন, মানুষের আয় না বাড়লেও কর ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান না থাকায় মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের ওপর নতুন করের চাপ সাধারণ মানুষের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে উৎসে কর বাড়ানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় বা এনবিআরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ থাকায় বিকল্প উপায় না পেয়ে এ ধরনের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।








