সপ্তাহজুড়ে ঊর্ধ্বমুখীর পর বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পুরো সপ্তাহজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেনে সামান্য দরপতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকলেও বাজারে স্বল্পমেয়াদি কিছু ইতিবাচক সংকেত এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬ সেন্ট বা ০ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ৭৬ দশমিক ২৪ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচারের দাম ৪ সেন্ট বা ০ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ০৪ ডলারে লেনদেন হয়।
তবে দিনের এই সামান্য মূল্যহ্রাস সত্ত্বেও পুরো সপ্তাহের চিত্র ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে সপ্তাহজুড়ে তেলের বাজারে শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি বজায় ছিল। সাপ্তাহিক হিসাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পথে রয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা যায়। সেদিন ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৮৬ সেন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৮৮ ডলারে পৌঁছায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওই দিনের মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, গত জুন মাসে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত অপরিশোধিত তেল উৎপাদন আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উৎপাদন দৈনিক ৩৩ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি পেয়ে মোট ১ কোটি ৯৪৩ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানিও দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি বেড়ে ১ কোটিরও বেশি ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ এখনও প্রায় ৪০ শতাংশ কম রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল এবং পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন হামলার জবাবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এতে কয়েক সপ্তাহ ধরে বজায় থাকা যুদ্ধবিরতির পরিবেশ নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বুশেহর অঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই এলাকাতেই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সপ্তাহজুড়ে চলা গণ-অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও বিভিন্ন সমাবেশের শেষ দিনে ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইকে দাফন করে। একই দিনে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি সচল করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রতিদিনের তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে সেখানে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এএনজেড ব্যাংকের সিনিয়র কমোডিটি স্ট্র্যাটেজিস্ট ড্যানিয়েল হাইন্স বলেছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান জোরদার হলেও দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। এ কারণে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে এবং বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আপাতত কমেছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ট্রাম্পের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে না এবং নতুন করে কোনো সংঘাত শুরু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্যও তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে। দেশটিতে গত সপ্তাহে বেকার ভাতার জন্য নতুন আবেদন আগের তুলনায় কমেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে, যেখানে নিয়োগ ও ছাঁটাই—উভয় প্রক্রিয়াই ধীরগতিতে চলছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জুন মাসে দেশটির উৎপাদক মূল্যস্ফীতি চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে উৎপাদনকারীরা পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। এতে শিল্পখাতের মুনাফার ওপর চাপ বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির কারণে চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই দুই বিপরীতমুখী প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে আগামী দিনগুলোতেও দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।








