Logo

স্বর্ণের দাম কেন কমছে, সামনে আবার বাড়তে পারে?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ জুলাই, ২০২৬, ১৬:৩৮
স্বর্ণের দাম কেন কমছে, সামনে আবার বাড়তে পারে?
ছবি: সংগৃহীত

বছরের শুরুতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর ধাপে ধাপে কমছে দেশের স্বর্ণের দাম। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নেমে এসেছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকায়। তবে এই নিম্নমুখী প্রবণতা কতদিন থাকবে, তা নিয়ে এখন ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের নানা অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম।

সম্প্রতি বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম দুই হাজার টাকার বেশি কমিয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা।

কেন কমছে স্বর্ণের দাম?

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদ ও স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি স্বর্ণের দাম বর্তমানে নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। যদিও প্রতিদিনই দামে ওঠানামা হচ্ছে, তবুও কয়েকদিন ধরে সামগ্রিকভাবে কিছুটা নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে। সেই প্রভাবই দেশের বাজারেও পড়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যে পরিবর্তন হয়, তার প্রভাব সাধারণত এক-দুই দিনের মধ্যে বাংলাদেশের বাজারে প্রতিফলিত হয়। তাই বিশ্ববাজারে দাম আরও কমলে দেশেও আবার মূল্য সমন্বয় হতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তখন অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদের হার ও ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তার মতে, বর্তমান দাম কমার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বৈশ্বিক সংঘাত আরও তীব্র হলে আবারও স্বর্ণের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সুদের হার ও ডলারের ভূমিকা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বর্তমানে স্বর্ণের বাজারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য সুদভিত্তিক সম্পদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। কারণ স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে কোনো সুদ পাওয়া যায় না। ফলে স্বর্ণের চাহিদা কমে যায় এবং দামেও চাপ পড়ে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় ডলারের মূল্য বাড়লে স্বর্ণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এতে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

চীনের সিদ্ধান্তও প্রভাব ফেলছে

বাজুসের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন মনে করেন, চীনের কয়েকটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, চীনা ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পেপার গোল্ড বা কাগজভিত্তিক স্বর্ণ বিনিয়োগ নগদায়নের নির্দেশ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

পেপার গোল্ড বলতে প্রকৃত স্বর্ণ হাতে না রেখে ডিজিটাল বা আর্থিক দলিলের মাধ্যমে স্বর্ণের মূল্যের ওপর বিনিয়োগকে বোঝায়।

সামনে কি আবার বাড়বে স্বর্ণের দাম?

বিজ্ঞাপন

স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান দাম কম থাকলেও এটি স্থায়ী হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।

দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম আবার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে কখন সেই বৃদ্ধি শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

তার মতে, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়লে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলে স্বর্ণের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এখন কি স্বর্ণ কেনার উপযুক্ত সময়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা অলংকার ব্যবহারের জন্য বা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতে চান, তাদের জন্য বর্তমান দাম তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশে বহু পরিবারে স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ সম্পদ হিসেবেও বিবেচিত হয়। সময়ের সঙ্গে এর মূল্য বৃদ্ধির ইতিহাস থাকায় অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বর্ণ কেনার কৌশল অনুসরণ করেন।

বিজ্ঞাপন

তবে যারা শুধুমাত্র বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতে চান, তাদের আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, সুদের হার এবং বাজুসের মূল্য সমন্বয়ের দিকে নজর রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD