কমছে ক্রয়ক্ষমতা, সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয়—সব মিলিয়ে জীবনযাপনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আয় কিছুটা বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো। সংসারের খরচ সামলাতে কেউ বাড়তি কাজ করছেন, কেউ কমাচ্ছেন মাছ-মাংস কেনা, আবার কেউ পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
ফেনীর দাগনভূঞার মুহাম্মদ ইউছুফের (৪৩) জীবন যেন এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। কক্সবাজার শহরে রিকশা চালিয়ে মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে পেশকার পাড়ার তিন কক্ষের একটি টিনশেড বাসায় থাকেন। পাঁচ বছর আগেও এর চেয়ে কম আয়ে সংসার মোটামুটি ভালোভাবেই চলত। এখন অভাব সামলাতে তাঁর স্ত্রী পাশের একটি মেসে রান্নার কাজ নিয়েছেন। দুই বেলা রান্না করে মাসে পান দেড় হাজার টাকার মতো।
পরিবারের খরচ মেটাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলে ইমরানও সকালে ও স্কুল শেষে স্থানীয় দোকানিদের ছোটখাটো কাজে সহায়তা করে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ টাকা আয় করে। সব মিলিয়ে পরিবারের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার মান কমেছে বলে মনে করেন ইউছুফ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
২০১৩ সালে যে বাসায় ৯০০ টাকা ভাড়ায় উঠেছিলেন, এখন সেই বাসার ভাড়া ৬ হাজার টাকা। একসময় দেড়শ থেকে দুইশ টাকার বাজারে পরিবারের তিন বেলার খাবার জুটত। এখন প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বাজার করেও প্রয়োজনমতো খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংসারে অভাবের পাশাপাশি বেড়েছে অশান্তিও।
বিজ্ঞাপন
আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে দ্রুত
ইউছুফের মতো কক্সবাজারের বহু শ্রমজীবী মানুষের সংসারেও চলছে টানাপড়েন। চাল, মাছ, মাংস, ডিম, তেল ও সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় খাবার কিনতেও হিমশিম খাচ্ছে। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাজারে ভালো মানের চালের কেজি ৬০ থেকে ৯০ টাকা। মোটা চালও ৫০ টাকার নিচে পাওয়া কঠিন বলে স্থানীয় ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা। সরকারি ব্যবস্থায় কম দামে চাল বিক্রির কার্যক্রম বা ওএমএসের চালও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
একসময় ডিম ও আলুভর্তা দিয়ে দুবেলা ভাত খেয়ে দিন পার করা গেলেও এখন ডিমের দামও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চাপ তৈরি করছে। সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। তুলনামূলক কম দামের ঝিঙা ও মিষ্টিকুমড়ার কেজি ৫০ টাকা, অন্য অনেক সবজির দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা বা তার বেশি। ফলে পুষ্টিকর খাবার কেনার ক্ষেত্রেও সংকুচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য।
শিক্ষার্থীদের মেসভাড়াও বেড়েছে
কক্সবাজার শহরের কালুর দোকান এলাকায় একটি মেসে থেকে পড়াশোনা করছেন ১৫ থেকে ২০ জন নারী শিক্ষার্থী। প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের ওই বাসায় মেস চালুর সময় আসনপ্রতি ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা। এখন একই আসনের জন্য দিতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মেসের সামগ্রিক ব্যয়ও বেড়েছে। আগে থাকা-খাওয়াসহ মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় চলতে পারলেও বর্তমানে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। এর সঙ্গে কলেজে যাতায়াতের ব্যয় যুক্ত হয়েছে। বাড়তি শিক্ষা ব্যয় বহন করতে না পেরে কেউ কেউ পড়াশোনা বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
বেতন বাড়লেও স্বস্তি নেই মধ্যবিত্তের
শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইকবাল হোসেন। ছয় বছর আগের তুলনায় তাঁর বেতন বেড়েছে, কিন্তু ছয় সদস্যের সংসার চালাতে এখন আগের চেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে। বাজার করতে গিয়ে প্রতিদিন চাল, সবজি, মাছ, মাংস ও ডিমের দামের ওঠানামা তাঁকে নতুন করে হিসাব মেলাতে বাধ্য করছে।
বিজ্ঞাপন
শহরের গৃহবধূ আমেনার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাঁর স্বামীর বেতন ছয় বছরে বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আগে মাসের খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হলেও এখন প্রতি মাসেই টানাটানি পড়ে। সংসারের ব্যয় সামলাতে মাছ-মাংস কেনা কমিয়েছেন তাঁরা।
আমেনা জানান, সন্তানদের চিকিৎসকের কাছে নিতে আগে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ফি দিতে হতো, এখন তা বেড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। শিশুখাদ্যের দামও বেড়েছে বলে জানান তিনি। ফলে সংসারের অন্যান্য খরচের সঙ্গে চিকিৎসা ও শিশুখাদ্যের ব্যয় সামঞ্জস্য করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর ঈদগাঁওর শিক্ষক আকরাম আলী একটি দোকান ও ছেলের আয়ে ১০ সদস্যের সংসার চালাতেন। পরে পরিবারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, আরেক ছেলেও পড়াশোনা শেষ করে সংসারের ব্যয়ে অবদান রাখছেন। তবু দুই দোকানের আয় ও সন্তানদের উপার্জন মিলিয়েও আগের মতো স্বচ্ছন্দে সংসার চালানো যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
আকরাম আলীর মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না একই হারে। ফলে ক্রেতাদের কেনাকাটা সীমিত হয়ে পড়েছে, ব্যবসার বিক্রিও আগের মতো নেই। এতে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখা কঠিন হচ্ছে।
অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সব শ্রেণিপেশার মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে জীবনযাত্রার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সরকারের জন্যও সহজ নয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকার মতে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে এবং বৈদেশিক সহায়তা কমেছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করছে এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। কৃষি ও খাদ্য খাতেও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়াই স্বাভাবিক। সাময়িক সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত কাগুজে মুদ্রা ছাপানো হলে মূল্যস্ফীতির ওপর তার গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে আয় বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমছে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে এবং শিক্ষা-চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খাতেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। জীবনধারণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে এই চাপ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








