Logo

৪০০ টাকার নিচে মিলছে না বিদেশি ফল, বাড়তি দামে দিশেহারা ক্রেতারা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭:১৬
৪০০ টাকার নিচে মিলছে না বিদেশি ফল, বাড়তি দামে দিশেহারা ক্রেতারা
ছবি: সংগৃহীত

যশোরের বাজারে বিদেশি ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পুষ্টিকর এসব খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট আকারের কাশ্মীরি আপেল ছাড়া অধিকাংশ বিদেশি ফলের কেজি ৪০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও বেদানার বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ আমদানি শুল্ক, ডলারের দামের ওঠানামা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ফলের বাজারে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আমদানিকারকদের একটি অংশের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত থাকার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

যশোরের পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চায়না ও গালা আপেল প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, আকারভেদে কমলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, বেদানা ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, মাল্টা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং আঙুর ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক ছোট আকারের কাশ্মীরি আপেলের দাম প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।

খেজুরের বাজারেও দামের পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে কম দামের বস্তা খেজুর প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, দাবাস খেজুর ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং মরিয়ম খেজুর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

উচ্চ শুল্ককে বড় বাধা বলছেন ব্যবসায়ীরা

যশোর ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘পুষ্টির চাহিদা মেটানোর অন্যতম উপকরণ ফল। অথচ সরকারের ট্যাক্সের তালিকায় এটি বিলাসী পণ্য। তাই আমদানিতে বিদেশি ফলে বিভিন্ন স্তরে (আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করসহ) ১২১ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। ফলে যে ফল ২৫০ টাকায় কেনা হয়, তার জন্য সরকাকেই ৩০০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয়।’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘যশোরাঞ্চলে ব্যবসায়ীরা মূলত আমদানিকারকদের কাছ থেকে ফল কিনে এনে সামান্য লাভে বিক্রি করেন। ফলে যেভাবে ব্যবসায়ীরা ফল কেনেন, সে হিসেবেই বিক্রি করেন।’

বিজ্ঞাপন

ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে সরকারের প্রতি শুল্ক কমানোর আহ্বান জানিয়ে সাইফুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘দামের কারণে সাধারণ মানুষ ফলের দিক থেকে সরে যাচ্ছেন। ট্যাক্স কমিয়ে দাম কমানো গেলে সব শ্রেণিপেশার মানুষই ফল কিনতে পারবেন।’

মণিহার এলাকার পাইকারি ফল বিক্রেতা জনি ফুড এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জিলানী জনি বলেন, ‘সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েই গলদ রয়েছে। ফল কোনোভাবেই বিলাসী পণ্য হতে পারে না। অথচ ফলে বিলাসী পণ্য হিসেবে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ২০ লাখ টাকার আপেল কিনে ৩০ লাখ টাকা শুল্ক দিতে হয়, তাহলে কীভাবে ফলের দাম কমবে?’

বন্দর জটিলতা ও পরিবহন ব্যয়েও বাড়ছে দাম

বিজ্ঞাপন

নাজ ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী রওশন জামিলের অভিযোগ, চট্টগ্রাম ও বেনাপোল বন্দরে আমদানি করা ফল খালাস করতে অহেতুক সময় ব্যয় হয়। কাস্টমসের বিভিন্ন জটিলতার কারণে পণ্য ছাড় করাতে বিলম্ব ঘটে। এতে ডেমারেজ বা অতিরিক্ত মাশুল দিতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়ে।

জিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মফিজুল ইসলাম মফিজ বলেন, ফল পচনশীল পণ্য হওয়ায় দীর্ঘ সময় গুদামে রেখে বিক্রির সুযোগ নেই। দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। তাঁর ভাষ্য, ‘ফল গুদামজাত করে রাখা যায় না। পচনশীল পণ্য হিসেবে দ্রুত বিক্রি করে দিতে হয়। ফলে দাম বেড়ে গেলে সবাই কথা বলে। কিন্তু দাম পড়ে গেলে, ফল নষ্ট হয়ে গেলে কেউ দেখে না। এজন্য আমদানির ক্ষেত্রে যদি পচনশীল পণ্য হিসেবে ফলের বীমা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।’

যশোর ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন চুন্নু আমদানি শুল্ককে ফলের উচ্চমূল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমসের জটিলতা, ডলারের সংকট ও মূল্য ওঠানামা এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এসব বিষয় সম্মিলিতভাবে ফলের বাজারকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ফলের দাম বাড়লে ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হলেও পণ্য খালাসে বিলম্ব কিংবা ফল নষ্ট হয়ে লোকসানের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ

বাজারের অস্থিরতার পেছনে সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, যশোরের অধিকাংশ ফল ব্যবসায়ী সরাসরি বিদেশ থেকে ফল আমদানি করেন না। তাঁরা চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও ঢাকা থেকে ফল কিনে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের দাবি, ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় ৩০ জন ব্যবসায়ী অধিকাংশ ফল আমদানির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাজারে ফলের সরবরাহ ও দাম অনেকটাই তাঁদের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। আমদানি কমিয়ে সরবরাহে সংকট তৈরি করা হলে দাম বেড়ে যেতে পারে বলে অভিযোগ তাঁদের। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

ফলের বদলে বিকল্প খাবার বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা

বিদেশি ফলের বাড়তি দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। আপেল, কমলা ও আঙুরের মতো ফল নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেও কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। পুষ্টির চাহিদা পূরণে অনেকে তুলনামূলক সস্তা ফলের দিকে ঝুঁকছেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শংকরপুর এলাকার গৃহবধূ নাসিমা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়ার পথে ৪৫০ টাকা কেজি দরে আপেল আর মাল্টা কিনেছি। এই দামে বাড়িতে ফল কিনে খাওয়ার উপায় নেই। ফল হিসেবে তাই কলা, ড্রাগন আর পেয়ারা খেতে হচ্ছে।’

দড়াটানা এলাকার দোকান কর্মচারী শাহিনুর হোসেন বলেন, ‘ফল বলতে এখন কলাকেই বুঝি। আপেল, কমলালেবুর দামও শুনি না। কখনো কখনো পেয়ারা, আনারস, ড্রাগন বা পেঁপে কিনে ছেলেমেয়েদের খেতে দিই।’

বাজার তদারকির কথা জানাল ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর

বিজ্ঞাপন

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, ফলের বাজারে নিয়মিত তদারকি চলছে। মণিহার এলাকার পাইকারি বাজারসহ বিভিন্ন ফলের দোকানে অভিযান চালানো হয়েছে। মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানাও করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীদের ক্রয়মূল্যের রসিদ সংরক্ষণ এবং বিক্রয়মূল্যের তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্রেতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে উচ্চ আমদানি শুল্ক, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওঠা অভিযোগের মধ্যে বিদেশি ফলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে শুল্কনীতি পর্যালোচনা, পণ্য খালাস দ্রুত করা এবং বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD