চলতি অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী সরকার

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সরকার। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সহায়তা দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার ধরন তুলে ধরে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘প্রথম বিষয় হচ্ছে, এই প্রথম আমাদের দেশের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আইএমএফসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থা- যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং জাইকা, চীনের এক্সিম ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা উল্লেখ করছে যে, আমাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই সংস্কারের ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহযোগিতাগুলো দেওয়া হচ্ছে এবং শুধু আইএমএফই না, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সহায়তা দিচ্ছে।’
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস নিয়ে সরকারের অবস্থান
আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, ‘এক ধরনের ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে। আইএমএফের যে পূর্বাভাস উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। তাদের এ বক্তব্য, অর্থাৎ যদি সংস্কার না হয়, তাহলে এই ধরনের প্রবৃদ্ধি এবং এ ধরনের মূল্যস্ফীতির বক্তব্য তাদের নিজস্ব।’
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে পার্থক্যের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পূর্বাভাসে একেকটা প্রতিষ্ঠানের একেক রকমের পূর্বাভাস। সাধারণত লক্ষণীয় যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রক্ষেপণগুলো আরও ওপরে থাকে।’
বিজ্ঞাপন
আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখব যে আর্টিকেল ফোর মিশনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে ৪ দশমিক ৭। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আগের যত বছরের গড় হিসাব করা যায়, আইএমএফের প্রক্ষেপণগুলো সবসময় সংরক্ষণশীল হয়।’
সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আশাবাদী যে আমাদের বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। কারণ সংস্কারগুলো আমরাই ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেছি এবং পরবর্তীতে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও উল্লেখ করেছি।’
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব
বিজ্ঞাপন
মূল্যস্ফীতির পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও অতীতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন উপদেষ্টা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে লক্ষ্য করেছি যে মূল্যস্ফীতির একটা বিরাট অংশ আসছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে। তাছাড়া অতীতে উত্তরাধিকারসূত্রেও আমরা প্রলম্বিত মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছি।’
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যে সব সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল, সেগুলো পতিত সরকারের সময় এবং অতীতে কার্যকর ছিল না। সবাই একমত যে, যাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তারা তালিকাভুক্ত হয়নি, যাদের তালিকাভুক্ত না হওয়ার কথা ছিল, তারা তালিকাভুক্ত হয়েছে। অধিকাংশ সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি ছড়ানো- ছিটানো ছিল।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গত তিন বছর ঠিকমতো সামাজিক সুরক্ষা বলয় না নেওয়ার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের কথা উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আইএমএফসহ বিশ্বব্যাংক সবাই উল্লেখ করেছে যে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো পদক্ষেপগুলো খুবই সঠিকভাবে সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, অর্থাৎ অরাজনৈতিক পদ্ধতিতে যাচ্ছি না। দ্বিতীয় বিষয়টি আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, আমরা একটা ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের দিকে যাচ্ছি।’
সামাজিক ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগ সম্পর্কেও কথা বলেন উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা একই সঙ্গে সব দাতা, যারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী, তারা আমাদের বলেছেন যে আমরা সামাজিক খাতে বিশেষ করে জিডিপির ৫ শতাংশের যে কথা বলেছি বা স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির যে ৫ শতাংশের কথা বলেছি, এগুলো সবই প্রশংসনীয় হয়েছে।’
বিজ্ঞাপন
উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ সহায়তার শর্ত ও কর্মসূচির আকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে কোনো ঋণের কিছু শর্ত থাকে। প্রোগ্রামটা আপনারা কীভাবে নিতে চাচ্ছেন, কত দিনের জন্য, কত পরিমাণের জন্য।’
সহায়তার পরিমাণ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি জানান, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই জানি যে একটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং সেই পদ্ধতি অনুযায়ীই এটা যাবে। আমরা এও মনে করি, যেহেতু আমরা প্রতিটি পদক্ষেপেই খুব দ্রুততার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছি, এক্ষেত্রেও দ্রুততার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ।’
কর্মসূচির আকার নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব আলোচনা, প্রোগ্রামের সাইজ, কোন প্রোগ্রামের সাইজটা আমরা জানি।’
বিজ্ঞাপন
ঋণ সহায়তার পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষি হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো সব দর-কষাকষির বিষয়।’ পরে তিনি আবারও বলেন, ‘সবই দর-কষাকষি। আমাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহযোগিতার হাত।’
কর আদায় বাড়ানো ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পরিকল্পনা
অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমাদের এখানে খুব পরিষ্কার মনে রাখতে হবে, এ বিষয়গুলো ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, আমরা কর-জিডিপির অনুপাত ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই।’
আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি যে আমানতকারী যাতে খেয়ানত না হন, সেই জন্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একটা আস্থা ফিরে এসেছে। তারপরে আইনি কাঠামোয় সংশোধন করা হয়েছে। নতুন নতুন আইন যুক্ত করা হবে।’
ব্যাংক খাতের অর্থ লুটের ঘটনায় জবাবদিহির তাগিদ
বিজ্ঞাপন
ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন উপদেষ্টা। তাঁর দাবি, অতীতের অনিয়মের আর্থিক বোঝা এখনো দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, ‘আমাদের সবসময় সদা সচেতন থাকতে হবে। সেটা হচ্ছে, পতিত সরকারের জন্য আজকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে ৪০ বিলিয়ন ডলার খেয়ানত দিতে হচ্ছে।’
খেলাপি ঋণের সমস্যা থেকে উত্তরণে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সম্মিলিত প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের এ খেলাপি ঋণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাঁদের সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যারা লুট করেছে বা যারা লুটপাটকারীদের সহায়তা করছে, সে দেশে হোক, বিদেশে হোক, সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে যে তাদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। কারণ এটা তো জনগণের অর্থ।’
তিনি আরও বলেন, ‘৪০ বিলিয়ন ডলার লুট করা হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে। আর অন্যান্য খাত থেকে কী অর্থ লুট করা হয়েছে, এটা তো একটা ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম।’
ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
পরে তিনি বলেন, ‘যারা যারা এই ধরনের লুটপাটকারীদের সহায়তা করছে, তারা যদি সহায়তা না করে, নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে কারও যদি দুরভিসন্ধি থাকে, সে কয়েকবার চিন্তা করবে।’








