Logo

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ পরিশোধে চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৮
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ পরিশোধে চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়—এই তিন চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয় মেটানো, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত রাখা সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তবে রিজার্ভের ওপর প্রকৃত চাপ নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রার আয়, আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এবং নতুন অর্থায়নের প্রবাহের ওপর।

প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে

বিজ্ঞাপন

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পূর্বাভাসটি বাস্তবায়িত হলে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর এটি হবে দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার।

অন্যদিকে, গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ৭ শতাংশের তুলনায় বেশি। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

রিজার্ভে দুই হিসাব, ব্যবধান ৪.৮১ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

দুই হিসাবের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। এই পার্থক্য হিসাব পদ্ধতির কারণে তৈরি হয়েছে। তাই রিজার্ভের পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে, সেটি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামনে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

পাঁচ বছরে ঋণের আসল-সুদ পরিশোধ ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ বাবদ ব্যয় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। আর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল ও বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে এসব দায় মেটাতে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। তবে মোট ঋণ পরিশোধের অঙ্ক দেখেই রিজার্ভের ওপর চাপের পূর্ণ মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। একই সময়ে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, নতুন ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে কত অর্থ আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

আমদানি ব্যয় বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে বেশি ডলার প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হয়।

এর সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন যুক্ত হলে আমদানিকারকদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আরও বাড়তে পারে। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই চাপ অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের অভ্যন্তরীণ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। শুল্ক কমানো বা আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে প্রত্যাশিত স্বস্তি নাও মিলতে পারে।

তবে আমদানি ব্যয় ও রিজার্ভের ওপর চাপ কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, আমদানির পরিমাণ, সরবরাহ চুক্তি, মূল্য পরিশোধের সময়সূচি এবং বিনিময় হারের ওপর।

প্রবৃদ্ধি কমলে রপ্তানি ও বিনিয়োগে ঝুঁকি

বিজ্ঞাপন

আইএমএফ চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের গতি নিয়ে এ পূর্বাভাস নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে প্রবৃদ্ধি কমলেই রপ্তানি আয় বা বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিতভাবে কমে যাবে, এমন নয়। আন্তর্জাতিক চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নীতির ধারাবাহিকতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা কমে গেলে কিংবা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি তৈরি হয়। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রণোদনা কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্যও স্থিতিশীল নীতি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে।

বৈদেশিক ঋণ নিয়ে কতটা উদ্বেগের কারণ রয়েছে

বিজ্ঞাপন

আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। তবে এই অঙ্ককে সরাসরি ঋণসংকট কিংবা রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ঋণের সুদের হার, মেয়াদ, পরিশোধের শর্ত, নতুন অর্থায়ন এবং সরকারি রাজস্বের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি সহজ শর্তের ঋণ ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ঝুঁকিও এক নয়।

তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রকল্পের সুফল ও ঋণ পরিশোধের দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ভবিষ্যতে বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।

রিজার্ভের চাপ সামলাতে যেসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কয়েকটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

প্রথমত, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বৈধ পথে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। কোন অর্থবছরে কত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, কোন প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে এবং নতুন ঋণে ভবিষ্যৎ দায় কতটা বাড়বে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।

তৃতীয়ত, আমদানি ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। নির্বিচারে আমদানি কমালে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পণ্যের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় প্রয়োজন। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ধরে রাখা নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা। বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো, ঋণের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD