Logo

ঢাকার আইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক: গবেষণা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ মার্চ, ২০২৬, ২০:২৯
ঢাকার আইসিইউতে ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক: গবেষণা
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার একাধিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ‘ক্যান্ডিডা অরিস’ নামের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক—এমন তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায়।

বিজ্ঞাপন

গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রাপ্তবয়স্ক গুরুতর অসুস্থ রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে এই ছত্রাক।

মঙ্গলবার প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলে সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক জার্নাল মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম-এ প্রকাশিত এই গবেষণা ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়। এতে সহযোগিতা করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং কারিগরি সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি)।

বিজ্ঞাপন

২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের ভর্তি হওয়ার পরপরই এবং অবস্থানকালীন সময়ে তাদের ত্বক ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। সন্দেহজনক নমুনা বিশেষ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে আইসিইউতে থাকার কোনো এক পর্যায়ে ক্যান্ডিডা অরিস শনাক্ত হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো— আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী আইসিইউতে ভর্তি থাকার সময়ই সংক্রমিত হয়েছেন। এতে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। সেখানে প্রায় ১৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকার সময় এই ছত্রাকে আক্রান্ত হয়েছেন। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে এ হার প্রায় ৪ শতাংশ। গবেষকদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্য এই ভিন্নতার একটি কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে পরিচালিত গবেষণায় সাধারণত ০.৫ শতাংশেরও কম রোগীর মধ্যে এই ছত্রাক পাওয়া গেছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যান্ডিডা অরিস অনেক সময় উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে অবস্থান করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

যেসব রোগীর শরীরে এই ছত্রাক পাওয়া গেছে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুতর অবস্থায় ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় আইসিইউতে ছিলেন। অনেকের ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, সেন্ট্রাল লাইন বা ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এসব পদ্ধতি জীবনরক্ষাকারী হলেও যথাযথ জীবাণুমুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব নমুনাই ফ্লুকোনাজল নামের বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। অধিকাংশ নমুনা ভরিকোনাজলেও সাড়া দেয়নি। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ দেখা গেছে। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ছে এবং কার্যকর ওষুধের বিকল্প সীমিত হয়ে আসছে।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং আইসিডিডিআর,বি’র ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ক্যান্ডিডা অরিস এখন শুধু নবজাতক নয়, সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে এবং প্রচলিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচিত কিছু নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউতে শনাক্ত ক্যান্ডিডা অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনের। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এটি এখন অঞ্চলটিতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে; কেবল বাইরের কোনো উৎস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আসা সংক্রমণ নয়।

গবেষকরা হাসপাতালের পরিবেশ নিয়মিত ও কার্যকর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস কঠোরভাবে নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা, যাতে সীমিত কার্যকর ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকাসহ সারাদেশে সমস্যাটির প্রকৃত বিস্তৃতি জানতে আরও বেশি হাসপাতালে বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। তা না হলে এই ‘সুপারবাগ’ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

জেবি/এএস
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD