বদলে গেছে ডেঙ্গুর ধরন, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ঢাকায় ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপে বড় ধরনের পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, গত কয়েক বছর দেশে ডেন-২ সেরোটাইপের আধিপত্য থাকলেও এবার ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় ডেন-৩-এর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ শনাক্ত হয়েছে। ফলে ভাইরাসের ধরন বদলের কারণে রোগটির জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঢাকায় পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ডেন-২ ছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং ডেন-৩ ছিল ৩৫ শতাংশ। গত দুই বছর ধরেই ডেঙ্গুর সেরোটাইপে পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা গেলেও চলতি বছর ঢাকায় ডেন-৩-এর দিকে বড় ধরনের শিফট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য জেলাতেও ডেন-২ থেকে ডেন-৩-এর দিকে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যদিও ঢাকার মতো এতটা ব্যাপক নয়।
দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বাড়তে পারে জটিলতা
বিজ্ঞাপন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সেরোটাইপ পরিবর্তনের ফলে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ডেন-২ সেরোটাইপের সংক্রমণ থাকায় অনেক মানুষের শরীরে ডেন-২-এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এখন ডেন-৩ বেশি ছড়িয়ে পড়লে আগে ডেন-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা নতুন সেরোটাইপে আক্রান্ত হতে পারেন।
ডেন-২ ও ডেন-৩ একই ভাইরাসের ভিন্ন সেরোটাইপ। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর তৈরি হওয়া প্রতিরোধক্ষমতা অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে একই মাত্রায় সুরক্ষা দেয় না। ফলে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু সংক্রমণের ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ডেন-২-এর আধিপত্য থাকায় অনেকের শরীরে ওই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। কিন্তু ডেন-৩-এর সংক্রমণ বাড়লে আগের সেই প্রতিরোধক্ষমতা পর্যাপ্ত সুরক্ষা নাও দিতে পারে। এতে গুরুতর ডেঙ্গু ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ডেন-৩ সংক্রমণে দ্রুত জটিলতার আশঙ্কা
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানিয়েছেন, ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্যের কারণে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী মাস থেকে দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেলেও বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন পাত্র, গর্ত ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা দ্রুত বাড়তে পারে।
এ কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬৪ জেলাতেই ছড়িয়েছে ডেঙ্গু
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। জেলা হিসেবে পিরোজপুরে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি।
আইইডিসিআরের একটি গবেষণা দলের সদস্য জানান, পিরোজপুরে নমুনা সংগ্রহের সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কাটা সুপারি গাছের গোড়ায় তৈরি হওয়া গর্তে জমে থাকা পানিতেও বিপুল পরিমাণ লার্ভা পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের মধ্যেই ডেঙ্গু সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণাপত্র প্রকাশের পর সেরোটাইপের বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞাপন
কয়েক বছরে বদলেছে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ
আইইডিসিআরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেন-১ ও ডেন-২ তুলনামূলক বেশি শনাক্ত হয়েছিল।
২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসের বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশের নমুনায় ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হয়।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঢাকায় পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৭০ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে ডেন-২-এর হার কমে প্রায় ৪৮ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে ডেন-৩-এর উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। চলতি বছর ঢাকায় সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং পরীক্ষিত নমুনার ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি সবচেয়ে বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৭০৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের।
বিজ্ঞাপন
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার ২২৫ জন। এরপর রয়েছে বরিশাল বিভাগ। সেখানে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামে ৪ হাজার ১০৬, খুলনায় ৩ হাজার ৪৬৭, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২২৩, রাজশাহীতে ১ হাজার ১৭০ এবং রংপুরে ৭০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে। সেখানে এ পর্যন্ত ১৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ডেঙ্গুর সেরোটাইপ পরিবর্তন, দেশজুড়ে সংক্রমণের বিস্তার এবং মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার প্রজননস্থল দ্রুত ধ্বংস, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের নতুন করে জ্বর হলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।








