প্রতিযোগিতার চাপে ট্রুকলার, বাড়ছে আশঙ্কা

অপরিচিত নম্বর শনাক্ত ও স্প্যাম কল ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় অ্যাপ ট্রুকলার এখন ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারকারীদের ভরসার জায়গা হয়ে থাকা এই কলার আইডি সেবাটি সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি ও বাজার অবস্থান—দুই ক্ষেত্রেই চাপ অনুভব করছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বব্যাপী ৫০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী থাকলেও ট্রুকলারের সবচেয়ে বড় বাজার ভারত, যেখানে প্রায় ৩৫ কোটির বেশি মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করেন। অর্থাৎ মোট ব্যবহারকারীর প্রায় ৭০ শতাংশই ওই দেশকেন্দ্রিক। স্প্যাম কলের আধিক্যের কারণে ভারতে অ্যাপটির দ্রুত বিস্তার ঘটেছিল এবং ধীরে ধীরে এটি দৈনন্দিন যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।
তবে এই নির্ভরশীল বাজারেই এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ট্রুকলার। ভারতে টেলিকম অপারেটররা ‘কলিং নেম প্রেজেন্টেশন’ (সিএনএপি) নামে নতুন একটি সেবা চালু করছে, যার মাধ্যমে সরাসরি নেটওয়ার্ক থেকেই কলারের নাম দেখা সম্ভব হবে। ফলে আলাদা কোনো অ্যাপ ছাড়াই একই সুবিধা পাওয়া যাবে, যা ট্রুকলারের মূল সেবার সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে স্মার্টফোন নির্মাতারাও তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমে কলার শনাক্তকরণ ও স্প্যাম ব্লকিং ফিচার যুক্ত করছে। বিশেষ করে অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা এই সুবিধা সম্প্রসারণ করায় ব্যবহারকারীরা এখন বিকল্প সমাধান পাচ্ছেন, যা ট্রুকলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে ভারতে ট্রুকলারের ডাউনলোড আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী ডাউনলোড কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। টানা কয়েক বছর বৃদ্ধির পর এই নিম্নমুখী প্রবণতা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ডাউনলোডের শীর্ষ সময় ছিল ২০২১ সাল, যখন প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডাউনলোড হয়েছিল। এরপর থেকে সংখ্যা কমতে শুরু করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা প্রায় ১২ কোটির আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে ট্রুকলারের শেয়ারের দাম প্রায় ৭৮ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরেও এর দরপতন হয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যদিও প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা কেবল কলার আইডি সেবায় সীমাবদ্ধ নেই। স্প্যাম শনাক্তকরণ, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং ব্যবসায়িক পরিচয় যাচাইয়ের মতো ক্ষেত্রেও কাজ বিস্তৃত করছে তারা। এ ছাড়া নতুন করে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফ্যামিলি প্রোটেকশন এবং কমিউনিটি সাজেশনসের মতো ফিচার চালু করা হয়েছে।
ট্রুকলারের আয়ের বড় অংশ আসে বিজ্ঞাপন থেকে, যা মোট আয়ের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে এই খাতেও চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে একটি বড় অংশীদারের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন ট্রাফিক কমে যায়, যা বিশ্লেষকদের মতে গুগলের নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এই নির্ভরতা কমাতে নতুন অংশীদার যুক্ত করা এবং নিজস্ব বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে এটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে সাবস্ক্রিপশন ও প্রিমিয়াম ফিচার থেকে আয় বাড়ছে। বর্তমানে ট্রুকলারের ৪০ লাখের বেশি অর্থপ্রদায়ী গ্রাহক রয়েছে, যারা উন্নত স্প্যাম সুরক্ষা, এআইভিত্তিক কল স্ক্রিনিং এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত ব্যবহারের সুবিধা নিতে অর্থ ব্যয় করছেন।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়িক সেবার দিকেও জোর দিচ্ছে ট্রুকলার। ‘ট্রুকলার ফর বিজনেস’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পরিচয় যাচাই করে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে, যা থেকে আয়ও বাড়ছে।
তবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা এখনও রয়ে গেছে। বিশাল ফোন নম্বর ডেটাবেইস কীভাবে তৈরি হয়েছে—এ নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠলেও ট্রুকলার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কোম্পানির দাবি, তারা সংশ্লিষ্ট আইন মেনেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।








