চীন-ইউরোপের চাহিদায় টেসলার বিক্রিতে ফিরেছে নতুন গতি

বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে কয়েক বছর ধরে বিক্রি ও চাহিদা কমে যাওয়ার চাপের মধ্যে থাকা টেসলা ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আবারও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে কোম্পানিটির সবচেয়ে ভালো ত্রৈমাসিক ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেসলা নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ সাইবারট্রাক, নতুন গণমানুষের উপযোগী মডেল আনতে বিলম্ব, স্বচালিত প্রযুক্তি ও রোবট উন্নয়নে অতিরিক্ত মনোযোগ এবং প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান ও বিতর্কিত মন্তব্য—সব মিলিয়ে বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যায়।
তবে সর্বশেষ প্রান্তিকের ফলাফল দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার বিক্রি এখনও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি, চীন ও ইউরোপের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক বিক্রিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে ইউরোপের অনেক দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে টেসলার বিক্রিতে। ডেনমার্কে কোম্পানিটির গাড়ির নিবন্ধন বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। সুইডেনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে পর্তুগাল ও ইতালিতেও বিক্রি প্রায় ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞাপন
একসময় ধারণা করা হয়েছিল, ইলন মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান ইউরোপীয় ক্রেতাদের একটি বড় অংশকে টেসলা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা সেই প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এ ছাড়া ইউরোপের বাজারে টেসলা চলতি বছর তুলনামূলক কম দামের মডেল ৩ এবং মডেল ওয়াইয়ের নতুন সংস্করণ উন্মুক্ত করেছে। পাশাপাশি সহজ কিস্তি ও আকর্ষণীয় লিজ সুবিধা চালু করায় অনেক নতুন ক্রেতাও প্রতিষ্ঠানটির দিকে ঝুঁকেছেন।
অন্যদিকে চীনের বাজারে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে টেসলা। নতুন কোনো সম্পূর্ণ নতুন মডেল না এনে বিদ্যমান জনপ্রিয় মডেল ওয়াইয়ের দীর্ঘ সংস্করণ বাজারে এনেছে কোম্পানিটি।
বিজ্ঞাপন
‘মডেল ওয়াই এল’ নামে পরিচিত এই সংস্করণে গাড়িটির হুইলবেস প্রায় ছয় ইঞ্চি বাড়ানো হয়েছে। ফলে এতে অতিরিক্ত একটি আসনের সারি যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং এটি এখন তিন সারির এসইউভি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে।
আগে টেসলার মডেল এক্স বড় পরিবারের জন্য জনপ্রিয় হলেও সেটির উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর কোম্পানির এমন একটি গাড়ির অভাব তৈরি হয়েছিল। নতুন মডেল ওয়াই এল সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিন সারির আসনের কারণে টেসলা এখন এমন একটি বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছে, যেখানে আগে তাদের উপস্থিতি প্রায় ছিল না। গত সপ্তাহ থেকে এই মডেল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বিক্রি শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
টেসলার আশা, নতুন এই সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বিক্রি বাড়াতে সহায়তা করবে। কারণ দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটিতে কোম্পানির বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
তবে নতুন মডেলটি নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। গাড়ির দৈর্ঘ্য বাড়ানো হলেও টেসলার স্বাক্ষরধর্মী ঢালু ছাদের কারণে শেষ সারির যাত্রীদের মাথার জায়গা এখনও কিছুটা সীমিত বলে মত দিয়েছেন অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞরা।
তুলনামূলকভাবে শুরু থেকেই তিন সারির জন্য ডিজাইন করা হুন্দাই আইওনিক ৯, কিয়া ইভি৯ এবং রিভিয়ান আর১এস-এর মতো মডেলগুলোতে শেষ সারির যাত্রীদের জন্য আরও আরামদায়ক জায়গা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তারপরও প্রায় ৬০ হাজার ডলারের প্রাথমিক মূল্যে বড় আকারের টেসলা কেনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক ক্রেতার কাছে মডেল ওয়াই এল আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি তৈরি করার পরিবর্তে বিদ্যমান প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দ্রুত নতুন সংস্করণ বাজারে আনা টেসলার জন্য সময় ও ব্যয়—দুই দিক থেকেই লাভজনক হয়েছে।
এই কৌশল ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে আরও বেশি দেখা যেতে পারে। কারণ উৎপাদন খরচ কমিয়ে দ্রুত বাজারে নতুন মডেল আনার জন্য বিভিন্ন নির্মাতা এখন বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইতোমধ্যে হোন্ডা তাদের প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে জেনারেল মোটরসের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছে। একইভাবে রিভিয়ানও ভবিষ্যতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের যানবাহন তৈরির সুযোগ রাখছে।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকের শক্তিশালী বিক্রি টেসলার জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপের বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং কম খরচে নতুন মডেল আনার কৌশল ভবিষ্যতেও প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








