ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় ভারতীয়দের গ্রিন কার্ড

যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর্মীদের মধ্যে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), কগনিজ্যান্ট, উইপ্রো, এইচসিএল, মাইক্রোসফট, ক্যাপজেমিনি ও অ্যাডোবির মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের সচিব কিথ সন্ডারলিং এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না। পাশাপাশি আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে এ সিদ্ধান্তের কারণে কর্মীদের বিদ্যমান অস্থায়ী কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে—এমন কোনো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের মধ্যেই এ পদক্ষেপ এসেছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করে জানায়, এ ধরনের পদক্ষেপ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে না।
স্থায়ী শ্রম সনদ কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা স্থায়ী শ্রম সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাধারণত কোনো নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হয়, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় কর্মীদের মজুরি বা চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এ প্রক্রিয়ায় আবেদন করেন নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, কর্মী নিজে নন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অনেক দক্ষ বিদেশি কর্মী এইচ-১বি অস্থায়ী কর্মভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ শুরু করেন। পরে যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। ফলে স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন বন্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পরিকল্পনা করা কর্মীদের অপেক্ষা বাড়তে পারে।
২০০৫ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি কর্মীদের জন্য স্থায়ী শ্রম সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা। নতুন স্থগিতাদেশের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কর্মীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
মাইক্রোসফটের নিয়োগ নিয়ে ভ্যান্সের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করে তাঁদের জায়গায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে। তাঁর দাবি, মাইক্রোসফট গত বছর ছয় হাজার মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করলেও ছয় হাজার ৩০০টি এইচ-১বি ভিসা এবং প্রায় তিন হাজার গ্রিন কার্ডের সুবিধা পেয়েছে।
তবে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের সরাসরি প্রতিস্থাপন করতেই এসব ভিসা বা গ্রিন কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিজ্ঞাপন
মাইক্রোসফটের বক্তব্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে তাদের করা এইচ-১বি ভিসার আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল আগে থেকে কর্মরত কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো অথবা তাঁদের অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। এসব আবেদন নতুন কর্মী নিয়োগের উদ্দেশ্যে করা হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট।
ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বল্প মেয়াদে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এ সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘদিন স্থগিতাদেশ বহাল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী নিয়োগ, স্থানীয় কর্মী দিয়ে কাজ পরিচালনা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত আইনি শর্ত পূরণের ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে জমা পড়া স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদনের দুই শতাংশেরও কম ছিল ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তবে গ্রিন কার্ড পাওয়ার সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কিছু কর্মী চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে পারেন।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে। সংগঠনটির মতে, এইচ-১বি ভিসা থেকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচির ওপর নির্ভর করেন তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মী।
বিজ্ঞাপন
দেশটির বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস জানিয়েছে, এ স্থগিতাদেশের কারণে তাদের কর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা কিংবা গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার কাজে প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গত দুই বছরে স্থায়ী শ্রম সনদের জন্য তাদের আবেদন ছিল খুবই কম।
বিদেশি কর্মী নিয়োগে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোরতা
বিদেশি কর্মীদের ভিসা ও স্থায়ী শ্রম সনদ ব্যবস্থায় অনিয়ম, কম মজুরি প্রদান এবং ভুয়া আবেদনসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে ট্রাম্প প্রশাসন তৎপরতা বাড়িয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন শ্রম দপ্তর ‘প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল’ নামে একটি তদারকি কার্যক্রম শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশ থেকে নিয়োগ করা কর্মীদের জন্য নতুন এইচ-১বি আবেদনে এককালীন এক লাখ ডলারের ফি আরোপের ঘোষণাও আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত মাসে কগনিজ্যান্টের গ্রিন কার্ডসংক্রান্ত আবেদন স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে এইচ-১বি ভিসা ও স্থায়ী শ্রম সনদ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য জালিয়াতি এবং মানব পাচারসংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেছে। এসব আবেদনের মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং এক লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সনদ পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে দপ্তর।
বিজ্ঞাপন
বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম মজুরিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে স্থানীয় কর্মীদের চাকরির সুযোগ সংকুচিত করছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোর বক্তব্য, বিদেশি কর্মীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগও বাড়ানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন স্থগিতাদেশ ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনায় বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে স্থগিতাদেশের মেয়াদ, আবেদনপ্রক্রিয়া পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত এবং মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী অভিবাসন নীতির ওপর।
তথ্য সূত্র : দ্য ইন্ডিপ্যান্ডেন্ট








