দিল্লিতে নির্বিচার আটক বন্ধের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের নির্বিচারে আটক বন্ধ, নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত এবং মেট্রো ও রেল পরিষেবা সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গণআটক ও পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধের অভিযোগের পর বিশেষ শুনানিতে আদালত এসব নির্দেশ দেন।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (১১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত শুনানিতে আদালত স্পষ্ট করেন, আইন ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিধান অনুসরণ করেই দিল্লিতে মানুষের চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর লাইভ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন বিক্ষোভের ডাক দেয়। কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লিতে হাজারো মানুষকে আটক করার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার আবারও ‘চলো যন্তর মন্তর’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় সিজেপি। দলটির যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আদালত বলেন, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি নেই—এমন এলাকায় শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র সমাবেশে অংশ নেওয়ার কারণে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ১৩ অক্টোবর।
বিজ্ঞাপন
মেট্রো, রেল ও ইন্টারনেট সচল রাখার নির্দেশ
শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনসম্মত বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন না থাকলে মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগও নির্বিঘ্ন রাখার কথা বলেছেন আদালত।
বিক্ষোভকারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে বসানো ব্যারিকেডগুলোর প্রয়োজনীয়তা দ্রুত পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নাগরিকদের স্বাভাবিক যাতায়াত নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এর আগে গত ৯ অক্টোবরের আদেশে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সে সময় আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী মেট্রো চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে যথাযথ কারণ ছাড়া পুরো পরিষেবা বন্ধ রাখা উচিত নয়।
আগের নির্দেশের আলোকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার এবং যান চলাচলসংক্রান্ত পরামর্শ প্রকাশের কথাও বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে চার দিনের মধ্যে সম্মতিপ্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। এবারের শুনানিতে আদালত কথিত আদালত অবমাননার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন এবং হলফনামাসহ সম্মতিপ্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান বিচারপতির
বিজ্ঞাপন
শুনানির একপর্যায়ে বিচারপতি মোহনা জনকল্যাণে আগ্রহী ব্যক্তিদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা সত্যিই জনকল্যাণে আগ্রহী, তাদের সবার শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অঙ্গীকার করা উচিত।
এর জবাবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ বলেন, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও একই ধরনের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা সুরক্ষিত রাখতে হবে। পুলিশ সদস্যদের পরিচয়চিহ্ন না পরাসহ বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের যে অভিযোগ উঠেছে, সেসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের জবাব চাওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট চত্বর ও আশপাশে বিএনএসএসের ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারির তথ্যসংবলিত একটি বোর্ড সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বোর্ডের কারণে কেউ যেন সুপ্রিম কোর্ট বা অন্য কোনো আদালতে প্রবেশ কিংবা সেখান থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার আশঙ্কা না করেন। বিচারপ্রার্থীদের আদালতে যাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
মুক্তি পেয়েছেন সিজেপির তিন নেতা
দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে আটক সিজেপির তিন নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রবিবার সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ স্টেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদের মুক্তির নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন দলটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং।
বিজ্ঞাপন
তবে আগামী এক বছরের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিন নেতার মুক্তির পর রবিবার দুপুর ২টায় দিল্লির প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে সিজেপি। দলটির জাতীয় সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অজিঙ্কা শিন্ডে সেখানে বক্তব্য দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
সিইসির বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের কর্মসূচি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে সোমবার দিল্লিতে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দলগুলোর জোট ইন্ডিয়া। ওই দিন জোটের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপও চাইবেন তারা।
বিজ্ঞাপন
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, সোমবার কংগ্রেস, ইন্ডিয়া জোট ও দেশের তরুণেরা আবারও বিপুলসংখ্যায় রাজপথে নামবেন। তাঁর ভাষ্য, এবারের প্রতিবাদের আওয়াজও সারা দেশে আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
শিক্ষার্থী ও নারীদের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার চার
এদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থী ও নারীদের ওপর হামলার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা নিজেদের হিন্দু রক্ষা দলের সদস্য বলে দাবি করেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সিজেপি ও কয়েকটি বামপন্থী সংগঠনের বিক্ষোভের সময় দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় (ডিডিইউ) মার্গে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রবিবার চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওতে কয়েকজন তরুণকে শিক্ষার্থীদের মারধর এবং নারীদের ধাক্কা দেওয়া ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করতে দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে একজন পুলিশ সদস্যকেও দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দিল্লি পুলিশ।








