আন্দোলনে উত্তাল ভারত, এবার কি মোদী সরকারের পতনের ডাক?

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনবিরোধী আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ, বিরোধী নেতাদের আটক এবং রাজপথে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে। আন্দোলনের মধ্যেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিদায়ের পর বর্তমান সরকারেরও বিদায় ঘটবে এবং এরপর গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে।
বিজ্ঞাপন
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ কি শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিতে পারে? বিরোধী দলগুলো কি বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে?
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্ক
ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটার এবং একাধিকবার নিবন্ধিত নাম রয়েছে। কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা নির্ভুল ও হালনাগাদ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলে নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ এবং কমিশনের আত্মপক্ষসমর্থনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
বিক্ষোভের আগেই ধরপাকড়, দিল্লিতে উত্তেজনা
বিজ্ঞাপন
এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠনটি এর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলন করেছিল। ওই আন্দোলনের চাপে গত জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার সংগঠনটির দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে হবে।
এই দাবিতে ১০ অক্টোবর দিল্লির জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তবে কর্মসূচি শুরুর আগেই পুলিশ ধরপাকড় শুরু করে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সংগঠনটির অন্য নেতাদের আটক করা হয়। শিক্ষার্থী, বিরোধী দলের রাজনীতিকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষও পুলিশের অভিযানের মুখে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দিল্লিতে তিন হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী আটকের কথা বলা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনাও ঘটে। মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার অভিযোগও সামনে এসেছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সীমিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি সামনে রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞাপন
আন্দোলনে বিরোধী জোটের সমর্থন, রাহুলের বার্তায় নতুন মাত্রা
সিজেপির কর্মসূচিকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আর একটি সংগঠনের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বিভিন্ন নেতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং কথিত ‘ভোট চুরি’ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।
তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চাওয়ার কথাও জানিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
বিজ্ঞাপন
এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্দোলনের চাপ ধরে রাখা গেলে সরকারের পতন ঘটতে পারে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বর্তমান সরকারের বিদায়ের কথা বলেন।
রাহুলের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, আন্দোলনের রাজনৈতিক লক্ষ্য এখন শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাঁর বক্তব্যে মোদী সরকারের বিদায়ের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে বিরোধী জোটের সব দল আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের পদত্যাগকে অভিন্ন দাবি হিসেবে গ্রহণ করেছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। ফলে রাহুলের বক্তব্যকে পুরো বিরোধী জোটের চূড়ান্ত অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের পাল্টা অবস্থান
বিজ্ঞাপন
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। বিজেপির বক্তব্য, নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ তুলে রাজপথে চাপ সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনও তাদের সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত বলে দাবি করেছে।
এতে বিরোধীদের অভিযোগ ও ক্ষমতাসীনদের পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি, জনসমর্থন এবং বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা কেন?
ভারতের চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তুলনা টানছেন অনেকে। এর কারণ, দুই ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনাকে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচি প্রথমে একটি নির্দিষ্ট নীতির পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং সরকারের সঙ্গে সংঘাত পরিস্থিতিকে বদলে দেয়।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক দফা দাবি ঘোষণা করে। সেই দাবির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগ। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কোনো আন্দোলন নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হলেও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে তার লক্ষ্য বিস্তৃত হতে পারে।
আরও পড়ুন
ভারতের আন্দোলনেও এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। বাংলাদেশের আন্দোলনে প্রাণহানি, ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিস্তৃত জনঅসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ভারতের বর্তমান আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কেন্দ্র হলো ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা।
রাহুল গান্ধী মোদী সরকারের বিদায়ের কথা বললেও, শুধু এই বক্তব্যের ভিত্তিতে ভারতের আন্দোলন নিশ্চিতভাবেই সরকার পতনের এক দফা দাবিতে পৌঁছে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না।
এক দফার পথে ভারত, নাকি এখনো অনিশ্চিত?
ভারতের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিজেপির নেতৃত্বে তরুণদের আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, বিরোধী জোট নিজেদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে এবং ভোটার তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই পরবর্তী পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা দেবে।
পাশাপাশি সরকারের প্রতিক্রিয়া ও আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্দোলনের পরিধি বাড়লে বিরোধীদের রাজনৈতিক দাবিও আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক জনসমর্থন, সংগঠিত রাজনৈতিক চাপ এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
সব মিলিয়ে, ভারতের নির্বাচন কমিশনবিরোধী আন্দোলন ইতিমধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য সেই বিতর্কে সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গ যুক্ত করেছে। কিন্তু আন্দোলন সত্যিই এক দফা দাবিতে পৌঁছাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করা গেলেও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্দোলনের গতিপথ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সূত্র: রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস








