ভূমি অফিসে চালু হচ্ছে ডিজিটাল নজরদারি

দেশের ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ ব্যবস্থার আওতায় মোবাইল অ্যাপ, জিও-লোকেশন এবং জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি, সময়মতো অফিসে না থাকা, ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, দালালচক্রের সক্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান সংগ্রহ কিংবা রেকর্ড সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা গ্রহণে নাগরিকদের নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যার সমাধান এবং জবাবদিহি বাড়াতে নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। জিও-লোকেশন প্রযুক্তির সহায়তায় তারা নির্ধারিত কর্মস্থলে অবস্থান করছেন কি না এবং দায়িত্ব পালনের সময় কোথায় রয়েছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অফিস বা দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন: সৌদি থেকে দেশে ফিরলেন ৫৭ হাজার ৬৯৯ হাজি
বিজ্ঞাপন
প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে ধাপে ধাপে দেশের সব ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি ও কারিগরি সহায়তা দেবে। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয় কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের একটি বড় অংশ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি ঘিরে। অনেক ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীরা অফিসে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পান না। আবার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তারা কোথায় অবস্থান করছেন, তা যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা বর্তমানে নেই। ফলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পারফরম্যান্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন সরাসরি তদারকি করা বাস্তবসম্মত নয়। যদিও মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবুও সব জায়গায় প্রতিনিয়ত উপস্থিত থেকে নজরদারি সম্ভব হয় না। এ সীমাবদ্ধতা দূর করতেই প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন অ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি।
অ্যাপ চালুর আগে ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা বা ইউজার ম্যানুয়াল প্রস্তুত করা হবে। সেখানে সফটওয়্যার ব্যবহারের নিয়ম, তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি, মনিটরিংয়ের পরিধি এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। বর্তমানে সফটওয়্যার উন্নয়ন ও পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। জুলাই-আগস্টের মধ্যে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নতুন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মার্টফোনে একটি বিশেষ অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে। অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে এবং একটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট অফিস, কর্মকর্তা বা এলাকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
বর্তমানে ভূমি প্রশাসনে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক নজরদারি চালু রয়েছে। মন্ত্রী, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আকস্মিক পরিদর্শন করেন। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিয়মিত তদারকি করেন। তবে দেশের বিপুলসংখ্যক ভূমি অফিসে প্রতিদিন সরাসরি নজরদারি করা সম্ভব না হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সূত্র জানায়, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত হয়েছেন কি না, দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠে গিয়েছেন কি না এবং পরে কর্মস্থলে ফিরেছেন কি না—এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হবে। ফলে দায়িত্ব পালনের অজুহাতে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভূমি সংক্রান্ত সেবা দেশের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিকানা, নামজারি, খাজনা প্রদান, রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু এসব সেবা নিতে গিয়ে বহু মানুষকে বারবার অফিসে যেতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুপস্থিতি বা কাজের ধীরগতির কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে সেবাদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ উদ্যোগ ঘিরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, এটি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নয়। বরং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে জনগণকে সেবা দিচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মনিটরিং কার্যক্রম অফিস সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং অফিস-পরবর্তী ব্যক্তিগত চলাফেরা বা কর্মকাণ্ড নজরদারির আওতায় আনার কোনো পরিকল্পনা নেই।








