বছরের পর বছর পেরোলেও শেষ হয়নি স্বজনদের অপেক্ষা

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। প্রিয়জনের সন্ধান পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে দিনটি ফিরে এসেছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর বেদনার স্মৃতি নিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশায় নতুন করে বুক বেঁধেছিলেন অনেক পরিবার। তবে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে এখনো ২৫১ জনের কোনো সন্ধান মেলেনি।
বিজ্ঞাপন
এবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাউ’। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে সমাবেশের আয়োজন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসের উদ্দেশ্য শুধু গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করা নয়; বরং জোরপূর্বক নিখোঁজের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। তাদের ভাষ্য, গুম বন্ধে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
১৬ বছরেও ফেরেননি চৌধুরী আলম
বিজ্ঞাপন
নিখোঁজদের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নাম বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। ২০১০ সালের ২৫ জুন ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তার স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী এখনো স্বামীর ফিরে আসার প্রত্যাশায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চৌধুরী আলমের নিখোঁজের ঘটনায় থানা পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে তার গুমের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চৌধুরী আলমের ছেলে ও শাহবাগ থানা বিএনপির নেতা আবু সাদাত সাওয়ান চৌধুরীর দাবি, মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তার ভাষ্য, সরকার তার বাবাকে মৃত ঘোষণা না করায় পরিবার এখনো তাকে ফিরে পাওয়ার আশা ছাড়েনি।
দেড় দশকে গুমের অভিযোগ ১,৯১৩
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় দেড় যুগের শাসনামলে ১ হাজার ৯১৩টি গুমের অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে কমিশন গুমের সংজ্ঞার আওতায় নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কমিশনের হিসাবে, ২৮৭টি অভিযোগ ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে কথিত ‘ক্রসফায়ার’ এবং নদী থেকে গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাও উঠে এসেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
এখনো নিখোঁজ ইলিয়াস আলী
বিজ্ঞাপন
বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনাও এক যুগের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ তিনি নিখোঁজ হন।

এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। আদালত রুল জারি করলেও ইলিয়াস আলী কিংবা তার গাড়িচালক আনসার আলীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের কথা বিভিন্ন সময়ে জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনা দেশ-বিদেশে গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়ন নিয়ে আলোচনার অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
বাবার স্নেহ ছাড়াই বেড়ে উঠছে আরাফ
বাবা পারভেজ হোসেনের নিখোঁজের পর ১১ বছর বয়সি আরাফ হোসেন বড় হচ্ছে বাবার স্নেহ না পেয়েই। পরিবারের অভিযোগ, আরাফের জন্মের কয়েক মাস আগে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে পারভেজকে তিন সহযোগীসহ তুলে নেওয়া হয়।

পারভেজ হোসেন ছিলেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। নিখোঁজ হওয়ার পর তার আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
বিজ্ঞাপন
তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর ওয়ারীর যোগীনগর এলাকায় বোনের বাসায় থাকেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে অভিযোগ করেন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেন।
ফারজানার প্রত্যাশা, একদিন তার স্বামী ফিরে আসবেন। সেই আশাতেই দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন তিনি।
১২ বছর ধরে নিখোঁজ ব্যবসায়ী কুদ্দুসুর
বিজ্ঞাপন
২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। পরিবারের অভিযোগ, সাদা পোশাকে একদল লোক তাকে তুলে নিয়ে যায়। ওই ব্যক্তিদের মধ্যে কুদ্দুসুরের পূর্বপরিচিতরাও ছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
তার সঙ্গে থাকা ভাতিজা মোহাম্মদ সাজাহান কয়েকজন অপহরণকারীকে চিনতে পেরেছিলেন বলেও পরিবার জানিয়েছে।
ঘটনার পর কুদ্দুসুরের স্ত্রী জোসনা বেগম পল্লবী থানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয় সদস্যের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। থানা পুলিশসহ পুলিশের দুটি বিশেষায়িত সংস্থা তদন্ত করলেও তার সন্ধান মেলেনি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
জোসনা বেগমের বিশ্বাস, তার স্বামী এখনো বেঁচে আছেন এবং কোনো একদিন ফিরে আসবেন।
সুমনের অপেক্ষাতেও কাটছে বছর
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর বিএনপির তৎকালীন ৩৮ নম্বর ও বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন।
বিজ্ঞাপন

নিখোঁজের পর থেকে তারও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সুমন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়কারী ছিলেন। বর্তমানে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির ভাই তিনি।
গুম প্রতিরোধ দিবসে নানা আয়োজন
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দিবসটির আয়োজনের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার গুম, খুন কিংবা নির্যাতনে বিশ্বাস করে না। আয়োজনে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুমের শিকার বিএনপি ও অন্যান্য ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
‘শুধু আইন করলেই হবে না’
গুম বন্ধে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে, প্রতিটি গুমের অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার এবং অতীতের ঘটনাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস তাই শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়। এটি তাদের প্রিয়জনের অবস্থান জানার, সত্য উদ্ঘাটনের এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোর দাবিরও প্রতীক।








