স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে সরকারি অধিদপ্তর হচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে সরকারি অধিদপ্তরে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থেকে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জনবলসহ সাংগঠনিক কাঠামোর খসড়া তৈরি করে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠাতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
বিজ্ঞাপন
অধিদপ্তরে রূপান্তর হলে বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়তে পারে। তবে বিলুপ্ত হবে বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের কাঠামো। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানটিকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি জানিয়ে আসছেন। সম্প্রতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় কর্মরত ১০ লাখের বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা রয়েছে। এ জন্য উপজেলা পর্যায়েও কার্যালয় ও প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু
বিজ্ঞাপন
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির নির্দেশ দেয়। চিঠিতে বলা হয়, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সেলের সপ্তম সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নির্ধারণের জন্য খসড়া সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে চেকলিস্টসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা নীতিনির্ধারণী বিষয়। বোর্ড অব গভর্নরসের কাছে আমরা উপস্থাপন করব। তবে আমরা এটাকে অধিদপ্তর করার প্রক্রিয়াও শুরু করছি। অন্যদিকে বোর্ড কী বলে, না বলে, সেটার জন্যও অপেক্ষা করছি।’
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। বোর্ড অব গভর্নরসের মতামত ও অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বোর্ডের বৈঠক কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে, বিলুপ্ত হবে বোর্ড
১৯৭৫ সালের ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এর নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বোর্ড অব গভর্নরস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিজ্ঞাপন
অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হবে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান স্বায়ত্তশাসন আর থাকবে না এবং বোর্ড অব গভর্নরসের কাঠামোও বিলুপ্ত হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
মন্ত্রণালয়ের সংস্থা অধিশাখার যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন অধিদপ্তর হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়তে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য বোর্ডের সভা ও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। দীর্ঘদিন বোর্ডের সভা না হওয়ায় কার্যক্রমেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অধিদপ্তর হলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত দিতে পারবে।’
বর্তমানে বাজেট অনুমোদন, বই প্রকাশ ও গবেষণার মতো কার্যক্রমে অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অধিদপ্তরে রূপান্তর হলে এসব বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও বাড়বে বলে মনে করেন যুগ্ম সচিব।
বিজ্ঞাপন
মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী জানান, বর্তমানে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিজস্ব আয় থেকেও ব্যয় নির্বাহ করে। অধিদপ্তরে রূপান্তর হলে অর্থায়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসতে পারে।
চাকরির সুবিধা বাড়ার সম্ভাবনা, জনবল নিয়ে অনিশ্চয়তা
অধিদপ্তরে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা, পেনশন এবং রাজস্ব খাতে জনবল অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আর্থিক সুবিধা কতটা বাড়বে এবং বর্তমানে কর্মরত কতজনকে রাজস্ব খাতে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৩১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সম্মানি বা ভাতার ভিত্তিতে ৭১ হাজার ১৮৫ জনসহ মোট ৮৪ হাজার ২৫৩ জন কর্মরত রয়েছেন।
মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী বলেন, ‘অধিদপ্তর হলে রাজস্ব খাতে জনবল বাড়ার সম্ভাবনা বেশি আছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব খাতের জনবলের পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক কর্মীরাও কাজ করছেন। অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হলে কোন পর্যায়ের কর্মীদের রাজস্ব খাতে আনা হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। মোট জনবল কত হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’
চাকরির সুযোগ-সুবিধা ও পেনশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটু সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি হলো, আমরা ফুল পেনশন পাব। এখন সরকার আমাদের বাজেট দেয়, আবার নিজস্ব ইনকাম জেনারেটও করতে হয়। তখন (অধিদপ্তর হলে) তো আর নিজস্ব ইনকাম থাকতে হবে না।’
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, অধিদপ্তর হলে জনবল বাড়বে নাকি কমবে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অর্থ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও প্রয়োজন হবে।
দীর্ঘদিনের দাবি, এখনো আসেনি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব
ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের দাবি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এখনো ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি।
বিজ্ঞাপন
যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন এবং বোর্ড অব গভর্নরসের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, অধিদপ্তরে রূপান্তরের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে এ পরিবর্তন করা সম্ভব। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বর্তমানে যে আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, অধিদপ্তরে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সেই আইন রহিত করতে হবে।
ধর্মীয় ও গবেষণামূলক কাজে স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসার সম্ভাবনা থাকলেও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ধর্মীয় ও গবেষণামূলক কাজের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে বোর্ড অব গভর্নরসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কিছু সিদ্ধান্ত নিজস্ব বিবেচনায় নিতে পারে। সরকারি অধিদপ্তরে পরিণত হলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ফাউন্ডেশনের কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোয় প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এতে কখনো কখনো ইসলামের মূলনীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে বলে তাদের মত।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ-ও মনে করেন, তাত্ত্বিকভাবে স্বায়ত্তশাসন একটি ভালো ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্নভাবে সরকারি প্রভাবের মধ্যে থাকে। ফলে আইনগতভাবে স্বায়ত্তশাসন থাকলেও বাস্তবে সরকারের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন।
বিজ্ঞাপন
উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। ধর্মীয় কল্যাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
মহাপরিচালক মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী জানান, উপজেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন কার্যক্রম আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে মডেল মসজিদ রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কিছু কর্মী ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত জনবলও কাজ করছেন।
তবে নতুন কার্যালয় স্থাপন, জনবল কাঠামো নির্ধারণ এবং বিদ্যমান কর্মীদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে প্রস্তাব পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর।








