কামেল পীরের প্রতি আদব প্রদর্শনার্থে মুরীদের করণীয়

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত আদাবুল মুরীদ। بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
বিজ্ঞাপন
কামেল পীরের প্রতি যথার্থ আদব প্রদর্শনার্থে মুরীদের করণীয় বিষয়াদির বিবরণঃ
কামেল পীর' পাওয়া অতি দুষ্কর। ভাগ্যগুণে কামেল পীর মিলে। আশেক সকল বলেন, "অতি ভাগ্যের জোরে মোর্শেদের বোল'।" ভাগ্যগুণে কামেল পীর পাইলে তাঁহার প্রতি আদব প্রদর্শন বা আদব রক্ষার উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর মুরীদের সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্তই কর্তব্য
নিজ পীরের প্রতি এমন বিশ্বাস রাখিবে যে, "পীর ভিন্ন অন্য কেহই আমাকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিতে পারিবে না।" নিজ পীর ভিন্ন আরও অনেক পীর থাকিতে পারে। কিন্তু কখনও তাঁহাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না। অর্থাৎ একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা স্বীয় পীর ভিন্ন অন্য কোন দিকে যেন না যায়। তরিকতের পরিভাষায় ইহাকে "তৌহিদে মতলব" বলে। যে মুরীদের "তৌহিদে মতলব" নাই, সে কেবল বিভিন্ন পীরের দরবারে ঘুরিয়া বেড়ায় কিন্তু মাঞ্জিলে মাকছুদে পৌঁছানো তাহার পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব হয় না।
বিজ্ঞাপন
পীর ধরার মুখ্য উদ্দেশ্যই খোদাতায়ালাকে অনুসন্ধান করা। তাই পীরের নিকট খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান ব্যতীত অন্য কিছু তলব করিতে নাই। অধিকাংশ মানুষই পীরের নিকট বায়াত হইয়া দুনিয়াকে অনুসন্ধান করে। দুনিয়ার যশ-খ্যাতি, মান-সম্মান, ইজ্জত-হুরমত, ধন-সম্পদ, অর্থ-কড়ি, গাড়ী-বাড়ী ইত্যাদির আশাতেই পীর ধরিয়া থাকে। অথচ তাহারা ভাবিয়া দেখে না যে, পীরে কামেল আল্লাহর পক্ষ হইতে নির্বাচিত হাদী বা পথ প্রদর্শক। দুনিয়ার বন্ধন মুক্ত করিয়া, নাফসের শৃংখল মুক্ত করিয়া তাঁহারা মানবজাতিকে আল্লাহমুখী করিবার জন্যই দুনিয়ায় আসেন। তাঁহাদের নিকট দুনিয়া তলব করার মত বোকামী আর কি হইতে পারে? কাজেই সর্বদাই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান বা মারেফত অর্জনের জন্য দেলের মুখকে পীরের দিকে মোতাওয়াজ্জু রাখিবে।
মারেফাতের চেয়ে বড় নেয়ামত আর কি থাকিতে পারে? হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব বলেন, "যে ব্যক্তি সত্যিকারের আল্লাহ প্রেমিক, সে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোন নেয়ামতেরই প্রত্যাশী নয়। দুনিয়ায় সে মান-মর্যাদা চায় না, ধনদৌলতের প্রতিও তাঁহার লোভ নাই। আর বেহেশতের লোভ-লালসা বা দোযখের ভয়-ভীতি তাঁহাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করিতে পারে না। সে চায় শুধু মাশুকের মিলন।"
সর্বাবস্থায় দেলকে পীরের দিকে রুজু রাখিবে। আল্লাহর পক্ষ হইতে যত রকমের নেয়ামত ও ফয়েজ দুনিয়াতে আসে-তাহা দয়াল নবী (সাঃ) এর পাক দেল' হইয়া পীরানে পীরদের দেলের অছিলায় আপন পীরের দেল হইয়া মুরীদের দেলে আসে। যেহেতু যাবতীয় ফয়েজ পীরের দেল বাহিত হইয়া মুরীদের দেলে আসে-কাজেই মুরীদকে নিজের দেল পীরের দেলের দিকে সার্বক্ষণিক মুতাওয়াজ্জুহ রাখিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
আকাশ হইতে সাগরে এক প্রকার বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টি হওয়ার পূর্বে সাগরের ঝিনুকদের দেলে এলহাম হয়। ঝিনুকসকল সাগরের পানির উপরের স্তরে আসিয়া মুখ খুলিয়া এক বিন্দু বৃষ্টির আশায় আকাশের পানে তাকাইয়া কাঁদিতে থাকে। স্বাতী নক্ষত্র যোগে আকাশ হইতে এক বিন্দু বৃষ্টির পানি-যে ঝিনুকের কান্না আল্লাহর নিকট পছন্দ হয়, তাহার মুখে পড়ে। সংগে সংগে ঝিনুকটি মুখ বন্ধ করিয়া সাগরের গভীর তলদেশে ডুব দেয়। সেই ঝিনুকের পেটে মূল্যবান মুক্তা পয়দা হয়। কাজেই যে মুরীদ নিজ দেলে মারেফাতের মুক্তা পয়দা করিবার ইচ্ছা রাখে, তাহার কর্তব্য পীরের দিকে সদা সর্বদা দেলকে মুতাওয়াজ্জুহ রাখা।
পীরের সম্মুখে দন্ডায়মান অবস্থায় পীর ভিন্ন অন্য কোন দিকে তাকাইবে না। কাহারো সাথে পীরের সম্মুখে কথাবার্তা বা গল্পগুজব করিবে না। পীরের আহবান শোনা মাত্রই হাতের কাজ ফেলিয়া পীরের সমীপে উপস্থিত হইবে। কোন মুরীদ যদি খাইতে বসে এবং তাহার খাবারের লোকমাপূর্ণ হাত যদি তাহার মুখ ও থালার মধ্যখানে থাকে -এমন সময়ও যদি পীরের ডাক পড়ে, তবে তৎক্ষণাৎ খাবার পরিত্যাগ পূর্বক পীরের নিকট উপস্থিত হইবে।
পীর কোন কাজে আদেশ করিলে অত্যন্ত মহব্বতের সাথে তাহা যথা শীঘ্র সম্পন্ন করিবে। একদা আমাকে পীর কেবলাজান হুজুর এনায়েতপুর দরবার শরীফের নিকটস্থ এক বাজার হইতে একটি সদাই (পণ্য) আনিতে আদেশ করিলেন। পীরের হুকুম পালনে এই অধীনের কোন অলসতা ছিল না। আমি দৌড়াইয়া বাজারে যাইয়া সদাই (পণ্য) ক্রয়পূর্বক পুনরায় দৌড়াইয়া পীরের সমীপে হাজির হইলাম। ইহা দৃষ্টে পীর কেবলাজান আমার প্রতি অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং বলিলেন, "বাবা, তুমি কি বাতাসের সাথে চল? এইমাত্র তোমাকে সদাই আনিতে পাঠাইলাম?” আমি নিশ্চুপ মাথা নীচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। কখনও পীরের নির্দেশিত কর্ম করিতে উচিৎ-অনুচিত চিন্তা করিবে না। পীরের আদিষ্ট কর্ম করিতে ভাল-মন্দ চিন্তা করিতে নাই।
বিজ্ঞাপন
দুই সহোদর ভ্রাতা এক কামেলের খেদমত করিত। কনিষ্ঠ ভ্রাতার প্রতি পীরের নেক দৃষ্টি একটু বেশীই পরিলক্ষিত হইত। একদা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পীরের সমীপে কনিষ্ঠের প্রতি পীরের অধিক স্নেহের অভিযোগ তুলিল। পীর ছাহেব তাৎক্ষণিকভাবে সেই অভিযোগের ফায়সালা না দিয়া জ্যেষ্ঠকে বলিলেন, "বাবা, আমার উটশালার বড় উটটিকে তুমি দোতলায় লইয়া যাও।" বড় ভাই পীরের ইশারা না বুঝিয়া আদবের খেলাফ করিয়া বলিয়া ফেলিল, "হুজুর! উট কি দোতলায় উঠিতে পারে?" পীর ছাহেব বলিলেন, "তাইতো বাবা, উটতো দোতলায় উঠিতে পারে না। আচ্ছা, তুমি তোমার ছোট ভাইকে ডাক।" ছোট ভাই আসিলে পীর ছাহেব তাহাকে একই নির্দেশ দিলেন। বলিলেন, "উটটিকে দোতলায় লইয়া যাও।" কনিষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিরুক্তি না করিয়া তৎক্ষণাৎ পীরের নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য উটটিকে রশি ধরিয়া টানিয়া দোতলায় নেওয়ার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। মুরীদ রশি ধরিয়া সম্মুখে টানেন। কিন্তু উটটি উপরে না উঠিয়া বরং পিছনের দিকে যাইতে চেষ্টা করে। বেশ কিছুক্ষণ এই রূপ টানা-হেঁচড়ার পরে, পীর ছাহেব কনিষ্ঠকে নিকটে ডাকিয়া বলেন, "বাবা, উট যে দোতলায় উঠিতে পারে না, আমি তাহা ভাল ভাবেই জানি। শুধু তৎপর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, "বুঝিলে? কেন পরীক্ষা করিবার জন্য এই নির্দেশ আমি তোমাকে দিয়াছিলাম।" আমি তোমার ছোট ভ্রাতাকে এত আদর করি?" ইহার কিছুদিন পরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মস্তিষ্ক বিকৃত হইল। আর ছোটভাই ওলী-আল্লাহ' হইলেন।
খোদাঅন্বেষী মুরীদকে পীরের সান্নিধ্যে থাকিতে হইবে। সান্নিধ্যে বা সাহচর্যে না থাকিলে এই জ্ঞান অর্জন করা যায় না। হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের চার পুত্রের মধ্যে একমাত্র মাসুম কামাল (রঃ) ছাহেব তাঁহার সান্নিধ্যে অধিক সময় থাকিতেন। তাই মুজাদ্দেদ ছাহেবও ইন্তেকালের পূর্বে মাসুম কামাল (রঃ) এর দেল মারেফাতে ভরিয়া দিয়া গেলেন। পীরের দরবার হইতে বিনা হুকুমে নিজ বাড়িতে বা অন্য কোথাও যাইবে না। পীরের দরবারে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে কোন বাড়ীতে মেহমান হইবে না। অথবা পথিমধ্যে কোথাও অযথা বিলম্ব করিবে না। আমি যখন পীরের দরবারে যাইতাম, যদি পথিমধ্যে রাত্রি হইত, তবুও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোন আত্মীয়ের বাড়ীতে মেহমান হইতাম না।
মুরীদ নফল নামাজে মগ্ন থাকাবস্থায় যদি পীরের ডাক শুনিতে পায়, তবে নামাজ ছাড়িয়া পীরের নিকট হাজির হইবে। "ইছলাহুল মোমেনীন" কিতাবে বর্ণিত আছেঃ একদা হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) ছাহেব নফল নামাজে মগ্ন ছিলেন। এমন সময় তাঁহার মোর্শেদ হযরত মঈনুদ্দিন চিন্তী (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে ডাকিলেন। ডাক শুনিবামাত্র তিনি মধ্যখানে নামাজ পরিত্যাগ করিয়া মোরশেদের খেদমতে হাজির হইলেন। হযরত খাজা চিন্তী (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "বাবা, তুমি কি কোন কাজে মশগুল ছিলে?" জবাবে কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "জ্বী হুজুর, আমি নফল নামাজ পড়িতেছিলাম। হুজুরের আহবান শোনামাত্রই নামাজ ছাড়িয়া ছুটিয়া আসিয়াছি।" হযরত চিশ্তী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "তুমি ভাল কাজ করিয়াছ। ইহা নফল নামাজ অপেক্ষা উত্তম।" পীরের তরফ হইতে কোন বস্ত্র বা অন্য কোন দ্রব্য বা পীরের ব্যবহৃত কোন জিনিস তাবাররুক" হিসাবে পাইলে ইহাকে মহামূল্য রত্ন মনে করিবে এবং তরিকতের উন্নতির স্বার্থে তাহা ব্যবহার করিবে।
বিজ্ঞাপন
একজন বার বৎসর পীরে কামেলের খেদমত করিলেন। বার (১২) বৎসর পর পীরে কামেল তাহাকে বলিলেন, "বাবা, তুমি বার বৎসর খেদমত করিলে, তোমাকে কি দিব।" তিনি একটা ছেঁড়া চটি জুতা মুরীদের হাতে দিয়া বলিলেন, "বাবা, তুমি এই ছেঁড়া চটি জুতাটা লইয়া যাও।" মুরিদ এই ছেঁড়া চটি জুতাতে খুশী হইল না। সে ইহার মর্তবা" উপলব্ধি করিতে পারিল না। চটি জুতাসহ মুরীদ বাড়ীর দিকে রওয়ানা হইল। কিছুদূর যাওয়ার পর পথিমধ্যে তাহার এক পীর ভাইয়ের সাথে দেখা হইল। সেই পীর ভাই ছিলেন এক জমিদার। পীরের অত্যন্ত দেলী মুরীদ ছিলেন তিনি।
দরবার শরীফের খাদেমকে দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, "আপনি কোথা হইতে আসিলেন?” সেই খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আমি দরবার শরীফ হইতে আসিলাম। কেবলাজান আমাকে বিদায় দিয়াছেন।" জমিদার ছাহেব বলিলেন, "কতদিন পর আসিলেন?" খাদেম ছাহেব উত্তর দিলেন, "বার বৎসর পর।" তখন জমিদার ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, "বার বৎসর খেদমত করিলেন, হযরত পীর কেবলাজান আপনাকে কি দিলেন?" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আমার কপাল মন্দ, পোড়া কপাল আমার। কেবলাজান হুজুর কি দিবেন আমাকে; একটা ছেঁড়া চটি জুতা দিয়াছেন।" জমিদার ছাহেব বুঝিতে পারিলেন যে খাদেম ছাহেব এই জুতার উপর খুশী হইতে পারেন নাই। তখন জমিদার ছাহেব বলিলেন, "ভাই আমার বাড়ী নিকটেই, অল্প একটু দূরে। আপনি আমার বাড়ীতে যাবেন। আমি আপনাকে জিয়াফত” করিলাম।" জমিদার তাহাকে বাড়ীতে লইয়া গেলেন এবং অতীব যত্নের সংগে তিনি নিজেই খাদেম হইয়া তাহাকে খাওয়াইলেন।
অতিথিসেবার পরে অতীব মহব্বত এবং যত্নের সংগে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, "ভাই, এই ছেঁড়া চটি জুতা মোবারক দিয়া আপনি কি করিবেন? খাদেম ছাহেব বলিলেন, "এই ছেঁড়া চটি জুতা দিয়া আমি কি করিব। এর মূল্যইবা কত? পীর কেবলাজান দিয়েছেন, তাই ঘরে উঠাইয়া রাখিব।” তখন জমিদার ছাহেব বিনীত ভাবে বলিলেন, "কোন কাজই যদি জুতা মোবারক দিয়া আপনি না করেন, তবে দয়া করিয়া উহা আমাকে দিয়া দেন।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "লইয়া যান।” জমিদার ছাহেব বলিলেন, "এই জুতা মোবারকের দাম কত দিলে আপনি খুশী হবেন?" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আপনি যা কিছু দেন, রাস্তাখরচ চলিবে।” তিনি একান্ত অনুরোধের সংগে বলিলেন, "ভাই! এই ছেঁড়া চটি জুতা মোবারক আপনার দীর্ঘ বার বছরের খেদমতের ফল। আমি ইহা অল্প দামে নিব না। যদি আপনি আমার কাছে কিছু চান তবে ভাল হয়।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "আপনার যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই দেন। কিই-বা আমি চাইব। কতইবা ইহার দাম। যা ইচ্ছা করে দেন, তাতেই হবে। আমি জানি এই জুতা অন্য কেউ নিবে না, এর দামও নাই।” জমিদার ছাহেব বলিলেন, "জুতা মোবারক যদি ইচ্ছা করিয়া আমাকে দেন-ই তবে আপনি নিজ হাতে উঠাইয়া দেন। আমি নিজ হাতে উঠাইয়া নিব না। কারণ ইহা আপনার বার বছরের পরিশ্রমের ফসল। আপনি দয়া করিয়া আমার হাতে উঠাইয়া দিন।” খাদেম জুতা মোবারক লইয়া জমিদারের হাতে উঠাইয়া দিলেন।
বিজ্ঞাপন
জমিদার অতি মহব্বতের সংগে, অতীব আদবের সাথে জুতা মোবারক হাতে লইয়া বহুবার চুম্বন খাওয়ার পর বাড়ীর ভেতর তাহার শয়ন কক্ষে লইয়া গেলেন এবং বিবিকে বলিলেন, "একটা চাদর বিছাইয়া দাও। আমি জুতা মোবারক চাদরের উপর রাখিব। পীর কেবলাজানের জুতা মোবারক। ইহা যেখানে সেখানে রাখা যাবে না।” চাদর বিছানো হইল। সেই জুতা মোবারক আতর গোলাপ দিয়া চাদরের উপর রাখিয়া দিলেন এবং বিবিকে বলিলেন, "বিবি, সিন্দুক খুলিয়া কিছু টাকা দাও।" বিবি বলিলেন, "কত টাকা দিব?" জমিদার বলিলেন, "হাজারী সত্তরটা তোড়া বাহির কর। কারণ এই জুতা মোবারকের দাম দেওয়ার ক্ষমতা কাহারোও নাই। তামাম পৃথিবী বিক্রয় করিলেও এই জুতার দাম হইবে না।" বিবি সত্তরটা তোড়া বাহির করিয়া তাহার স্বামী জমিদারের হাতে দিলেন।
জমিদার সেই টাকা লইয়া খাদেম ছাহেবের কাছে গেলেন এবং বিনীতভাবে বলিলেন, "ভাই, এই জুতা মোবারকের দাম দেওয়ার ক্ষমতা তো কাহারো নাই। আমি মিছকিন হালাতে যা দিতেছি দয়া করিয়া গ্রহণ করেন। এই বলিয়া ৭০ হাজার টাকা খাদেম ছাহেবের হাতে দিলেন।" খাদেম ছাহেব বলিলেন, "এত টাকা কেন আপনি আমাকে দিলেন, এর দাম কি এত হবে?" জমিদার বিনীতভাবে বলিলেন, "আপনি দয়া করিয়া কবুল করেন। তবে এত টাকা লইয়াতো আপনি একা যাইতে পারিবেন না। তাই আমি চারজন সশস্ত্র বরকনদাজ (গার্ড) আপনার সংগে দিতেছি। কারণ পথিমধ্যে দস্যুরা আপনাকে মারিয়া ফেলিতে পারে।" খাদেম ভাবিতে লাগিলেন, কিন্তু রহস্য কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। জমিদার ছাহেব কেনইবা এত টাকা তাহাকে দিলেন। কোন বিপদে ফেলিবার অভিসন্ধি আছে কি না কিছুই ভাবিয়া পাইলেন না।
জমিদার ছাহেব চারজন বরকনদাজকে বলিলেন, "যাও আমার পীর ভাইয়ের সংগে। সত্তর হাজার টাকা দিয়া দিলাম। ষাট হাজার টাকা দিয়া জমিদারী ক্রয় করিয়া দিও এবং দশ হাজার টাকা দিয়া বাড়ী করিয়া দিও। তাহাকে লইয়া যাও আদবের সাথে। কোন বেয়াদবী যেন না হয়। প্রয়োজন হইলে আরোও ২/১ হাজার টাকা নিও।"
বিজ্ঞাপন
খাদেম ছাহেব চারজন বরকনদাজসহ টাকা লইয়া চলিয়া গেলেন। বাড়ী যাওয়ার পর ষাট হাজার টাকা দিয়া জমিদারী ক্রয় করিলেন এবং ১০ (দশ) হাজার টাকা দিয়া বাড়ী করিলেন। খাদেম দুনিয়াদারীতে পূর্ণ সুখী হইলেন। অন্য দিকে জমিদার ছাহেব সেই ছেঁড়া চটি জুতা মোবারককে একটা বালিশের ভিতর করিয়া রাত্রিতে শয়নকালে ঐ বালিশ শিয়রে লইয়া শুইয়া থাকিতেন। আর হর" রাত্রিতে তিনি স্বপ্নে দেখিতেন তাহার পীর কেবলাজানকে। তিনি দেখিতেন, তাহার পীর কেবলাজান আসিয়া তাহাকে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরিকতের নিয়ম কানুন শিখান। মাত্র কয়েক দিনের ভিতর তাহার পীর কেবলাজান তাহাকে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরিকতের নিয়ম-পদ্ধতি শিখাইয়া মাঞ্জিলে মাছুদে পৌছাইয়া দিলেন, যেমন বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) ছাহেব একটা চোরকে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর দ্বারা অল্পক্ষণের ভিতরে ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন।
এরপর জমিদারের বাড়ীতে লোকজন আসা শুরু করিল। জমিদার মুরীদ করিতে লাগিলেন। মুরীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অল্প দিনের মধ্যেই দরবার বড় হইল যেন সেই পূর্বের পীরের দরবার। কিছুদিন পর খাদেম ভাবিল, "একটা ছেঁড়া চটি জুতার বদলে এতগুলো টাকা যে আমাকে দিয়া দিল, সেই আহাম্মকের অবস্থা কি আমি গিয়া দেখিব।" তাই তিনি গেলেন এবং যাহা দেখিতে পাইলেন তাহাতে আশ্চর্য হইলেন। যেন তাহার পীরের দরবার। দৈনিক হাজার হাজার মানুষ আসিতেছে। হাজার হাজার টাকা নজরানা দিতেছে। মুরীদ হইতেছে। জেকের আজকার করিতেছে। সেই বিশাল কর্মকান্ড যাহা তাহার পীরের দরবারে ছিল। তিনি সত্তর হাজার টাকা দিয়াছিলেন। আর প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা স্রোতের মত আসিতেছে। দেখিয়া খাদেম ছাহেব অবাক হইলেন।
খাদেম ছাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, "ভাই, এই অপূর্ব বাজার আপনি কেমনে মিলাইলেন? যাহা হযরত কেবলাজানের দরবারে দেখিয়াছিলাম তাহা সবই আপনার দরবারে দেখিতেছি। কি ভাবে আপনি ইহা তৈরী করিলেন?" জমিদার বলিলেন, "ভাই, ইহা তো আপনিই দিয়াছেন। আপনি যে ছেঁড়া চটি জুতা দিয়াছিলেন, সেই জুতা মোবারক বালিশের ভিতর ভরিয়া শিয়রে দিয়া শুইয়া থাকিতাম। তখন হযরত পীর কেবলাজান হর রাত্রিতে স্বপ্নযোগে আসিয়া তাওয়াজ্জুহ দ্বারা তরিকতের নিয়ম পদ্ধতি শিখাইতেন। এই ভাবে তাওয়াজ্জুহ দ্বারা আমাকে মাঞ্জিলে মাজ্জুদে পৌছাইয়া দিয়াছেন। তারপর থেকেই আল্লাহপাকের এই বিশাল দান।"
বিজ্ঞাপন
উল্লিখিত কাহিনীতে দেখা যায়, একজন মুরীদ ১২ বছর খেদমত অন্তে পীরের নিকট থেকে একটি ছেঁড়া চটি জুতা পাইলেন। মুরীদ সেই ছেঁড়া জুতার মূল্য বুঝিতে না পারিয়া কিছু টাকার বিনিময়ে তাহারই এক জমিদার পীর ভাইয়ের নিকট বিক্রয় করিয়া দিলেন-যাহা ছিল বেয়াদবীর সামিল। জমিদার ছাহেব পীরের সেই জুতাকে অমূল্য সম্পদ মনে করিয়া নিশীথে বালিশে ভরিয়া শিয়রে দিয়া শুইয়া থাকিতেন। পীরের প্রতি জমিদারের এই চরম আদব দেখিয়া আল্লাহপাক তাহাকে মারেফাতের জ্ঞানে ভরপুর করিয়া দিলেন। অন্যদিকে ১২ বছর খেদমতের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই ছিন্ন জুতার মূল্য না বুঝিতে পারিয়া খাদেম খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হইলেন।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেব তাঁহার মকতুবাদ শরীফের ২৯২ নং মকতুর্বে বলেন, হযরত মীর্জা ছাহেব (রঃ) তিনি রাত্রিতে এই টুপী ভিজাইয়া রাখিতেন এবং সকালে তাহা তাঁহার পীরের একটি টুপী তাবারুক হিসাবে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহার যেইরূপ বাতেনী উন্নতি হইয়াছিল, সেই রূপ আর অন্য মর্দন করতঃ মলিন পানি পান করিতেন। তিনি বলিতেন, ইহাতে কোন আমল দ্বারা হয় নাই।
খলিফা সুলতান মাহমুদ হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেবের ভক্ত ছিলেন। হযরত খেরকানী (রঃ) ছাহেব সুলতান মাহমুদকে তাহার একটি পিরহান তাবারুক হিসাবে প্রদান করিয়াছিলেন।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু সুলতান মাহমুদ সেই খেরকাটির যথার্থ মূল্য দিতে পারে নাই। একদা কোন এক ধর্মীয় যুদ্ধে শত্রুপক্ষের নিকট নিজ দলের পরাজয় আসন্ন দেখিয়া সুলতান মাহমুদ খুবই বিচলিত হইয়া পড়েন। তিনি হঠাৎ ঘোড়া হইতে অবতরণ করিয়া সেজদায় পড়িয়া খেরকানী (রঃ) ছাহেবের সেই পিরহানটি হাতে লইয়া উচ্চস্বরে বলিতে থাকেন, "হে পাক পরোয়ারদিগার! এই খেরকার মালিকের ইজ্জতের ছদকাস্বরূপ আমাকে এই শত্রুদের উপর জয়ী করুন। এই যুদ্ধে যাহা কিছু গণিমতের মাল প্রাপ্ত হইব-সব কিছুই আমি দরবেশদেরকে দান করিব।" দু'আ শেষ হইতে না হইতেই হঠাৎ শত্রু সৈন্যদের মধ্যে হট্টগোল এবং বিভেদ সৃষ্টি হইল। তাহারা নিজেরাই পরস্পর যুদ্ধ করিয়া মরিতে লাগিল। আর যে যেদিকে পথ পাইল সে দিকেই পলায়ন করিল, শেষ পর্যন্ত মুসলিম সেনা বাহিনীর জয় হইল। সেই রাত্রে সুলতান মাহমুদ স্বপ্নে দেখিলেন যে, হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে বলিতেছেন, "হে মাহমুদ! তুমি এই সামান্য কাজের জন্য আল্লাহপাকের দরবারে আমার খেরকার অছিলা ধরিয়াছ। ইহা ঠিক কর নাই। ওরে গাফেল! যদি তুমি আমার খেরকার অছিলা ধরিয়া সমস্ত কাফেরদের মোসলমান হইয়া যাওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রার্থনা করিতে, তবে সকলেই মোসলমান হইয়া যাইত।"
কাজেই পীরের তরফ হইতে যদি ভাগ্যক্রমে কোন কিছু তাবারুক হিসাবে পাও, তবে তাহার যথার্থ মূল্য দিবে। তাহা হইলে আল্লাহপাক তোমার উপর খুশী হইবেন এবং উত্তম বিনিময়ও তোমাকে দান করিবেন।
নিজ পীরের সম্মুখে কখনও অন্য পীরের প্রশংসা করিবে না। ইহা আদবের খেলাফ। একদা হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেব রাসূলে পাক (সাঃ) এর সম্মুখে হযরত মুসা (আঃ) এর প্রশংসা করিয়াছিলেন। ইহাতে রাসূলে করীম (সাঃ) হযরত উমর ফারুক (রাঃ) ছাহেবের উপরে রাগান্বিত হইয়া বলিয়াছিলেন, "যদি মুসা (আঃ) বর্তমানে জীবিত থাকিতেন, তবে আমার দীন গ্রহণ করিতেন।"
বিজ্ঞাপন
পীরের কোন হুকুম যদি শরীয়তের খেলাফ মনে হয়, তবুও বিনা দ্বিধায় তাহা পালন করিবে। তবেই কল্যাণ। কারণ কামেল পীর যাহা কিছুই করেন না কেন, তাহা এলহামের নির্দেশে করেন। কাজেই শরীয়তের খেলাফ কোন কর্মই কোন কামেল করিতে পারেন না। যখন বুঝ খুলিবে, তখন বুঝিতে পারিবে। মূল কথা, পীরের আদেশ বিনা দ্বিধায় পালনের ভিতরেই মুরীদের মঙ্গল নিহিত। মহা কবি হাফেজ কি সুন্দরই না বলিয়াছেন,
"ব মায়ে সুজ্জাদা রুংগীকুন গারব পীরে মগা গুয়েদ, কে ছালেক বেখবর না বুয়াদ যে রাহ্ ও রেছমে মঞ্জেল হা।"
অর্থাৎ -"তোমার পীর যদি তোমাকে শরাব দিয়া জায়নামাজ ধুইয়া তদ্ উপরে নামাজ পড়িতে বলেন, তুমি তাহাই কর। কারণ মোকাম মঞ্জিলের পথ তোমার চেয়ে তোমার পীরই ভাল জানেন।"
সর্বাবস্থায় অর্থাৎ চলা-ফেরা, উঠা-বসা, পানাহার, শয়ন-উপবেসন ইত্যাদিতে পীরকে অনুসরণ করিবে। ইহাতে বহু মঙ্গল লুক্কায়িত। আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "তোমরা পীরের খাছলতে খাছলত" ধর-তবেই ত্রাণ ও শান্তি।"
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব তদীয় "মাবদা ওয়া মা'আদ" পুস্তিকাতে বলেন, মুরীদগণ যে কোন কামালিয়াত বা পূর্ণতাই লাভ করুক না কেন, তাহা স্বীয় পীরের অনুসরণ সত্য হইতে উৎকৃষ্ট। তাই হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) ছাহেব কর্তৃকই তাহারা লাভ করিয়া থাকে। পীরের ভুল-ত্রুটিও মুরীদের বলিয়াছিলেন, "আফসোস! যদি আমি দয়াল নবী (সাঃ) এর ভুল-ত্রুটিও হইতাম।"
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব একই পুস্তিকাতে আরও বলেন যে, "জনৈক বুযুর্গের নিকট আমি শুনিয়াছি যে পূর্ববর্তী বুযুর্গ ও ওলী-আল্লাহগণ হইতে যে সকল দু'আ ও অজিফা বর্ণিত আছে; ঘটনা ক্রমে তাঁহারা ঐ সকল দু'আ ও অজিফার মধ্যে যাহা ভুল ও বিকৃতভাবে পাঠ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের অনুগামী ও মুরীদগণ যদি উহা ঐ ভাবেই পাঠ করেন, অর্থাৎ ভুলসহ, তাহা হইলে উক্ত অজিফার পূর্ণ তাছির ও উপকারিতা লাভ হয়। কিন্তু যদি উহা তাহারা শুদ্ধ ভাবে পড়িতে যায়, তাহা হইলে উহা তাছিরশূন্য ও উপকাররহিত হইয়া থাকে।" কাজেই সর্বাবস্থায় পীরের অনুসরণ করাই উত্তম।
পীরের সহিত সাক্ষাতান্তে হোজরা' হইতে বাহির হওয়ার সময় এমন ভাবে প্রস্থান করিবে যেন, পীরের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতে না হয়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের পীর ছিলেন হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব। তিনি খাজা ছাহেবের প্রতি অতিশয় আদব প্রদর্শন করিতেন। পক্ষান্তরে হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব যখন মহান খোদাতায়ালার দয়া ও অনুকম্পায় মারেফাতের শেষের শেষ মাকামে নীত হন এবং হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেবেরও বহু ঊর্ধ্বে গমন করেন, তখন পীর হওয়া সত্ত্বেও হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব মুরীদ মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের নিকট হইতে ফয়েজ হাছিলের জন্য তাঁহার প্রতি যে আদব প্রদর্শন করেন -তাহা প্রণিধান যোগ্য।
কিতাবে দেখা যায়, হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেবের হোজরার দরজায় জোড় হাতে দাঁড়াইয়া থাকিতেন এবং তাঁহার হোজরা হইতে ফিরিবার পথে উল্টা পায়ে আসিতেন-যাহাতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতে না হয়।
হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব খাজা ছাহেবের এমন আচরণে লজ্জিত হইতেন। তিনি মাঝে মাঝে বলিতেন, "এই নিকৃষ্ট খাদেমের প্রতি হযরত যেইরূপ আদব ও সম্মান প্রদর্শন করেন, তাহাতে এই অধম লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়।"
হযরত বাকীবিল্লাহ (রঃ) ছাহেব জবাব দিতেন, "আল্লাহপাকের নির্দেশ ছাড়া আমি কিছুই করি না। অদৃশ্য হইতে এলহাম মারফত আমাকে যাহা করিবার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহার বাইরে আমি কিছুই করি না।" খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞান হাছিলের পথে পীরের প্রতি আদব সম্মান দেখানোর এমন নজির খুবই বিরল।
হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেবের পীর ছিলেন হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেব। উল্লেখ্য যে, বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের ইন্তেকালের ঊনচল্লিশ বছর পরে হযরত খেরকানী (রঃ) ছাহেবের জন্ম। খেরকানী (রঃ) ছাহেব চর্মচক্ষে বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবকে দেখেন নাই। কিন্তু তাঁহার সাধনা জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাযার" জেয়ারত” করিতেন।
বর্ণিত আছে, তিনি প্রথম জীবনে বিশ (২০) বছর যাবৎ এই অভ্যাস করিয়া লইয়াছিলেন যে, খেরকানে এশার নামাজ জামাতের সহিত পড়িয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ছাহেবের মাযার জেয়ারতে বোস্তামে যাইতেন। মাযার জেয়ারতান্তে দাঁড়াইয়া এই দু'আ করিতেন, "হে খোদাতায়ালা! যে নেয়ামত ও মারেফাত আপনি বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) কে দান করিয়াছেন, উহার কিছু অংশ আমাকেও দান করুন; এইরূপ দু'আ করিয়া তিনি রাত্রিতেই খেরকানে ফেরত আসিতেন এবং এশার নামাজের ওযু দ্বারাই ফজরের নামাজ খেরকানে আসিয়া আদায় করিতেন। তিনি মাযার হইতে প্রত্যাবর্তন কালে মাযারের দিকে মুখ রাখিয়া উল্টা পায়ে পিছনের দিকে হাঁটিয়া খেরকানে পৌঁছাইতেন।
খেরকানী (রঃ) এর এমন নজীরবিহীন আদব প্রদর্শন করিতে দেখিয়া হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) বার (১২) বছর অন্তে মাযার হইতে খেরকানী (রঃ) ছাহেবের প্রতি নেক নজর দিলেন এবং তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া তাঁহাকে খোদাতায়ালা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিলেন।
সেই মহান সাধক, এলেমের দারয়া, হযরত আবুল হোসেন খেরকানী (রঃ) ছাহেব ইন্তেকালের পূর্বে শেষ যে ওসীয়ত করেন সে ওসীয়তও ছিল আদব প্রসংগে। ওসীয়তে তিনি বলেন, "আমার কবর ত্রিশ হাত গভীর হইলে খুশী হইবো। আমার এই শহর বোস্তামের মাটির চেয়ে উঁচু। হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর (রঃ) কবরের তুলনায় উঁচুতে অন্তিম শয্যা রচিত হইলে আবার বেয়াদবী হয় কিনা।"
পীরের কার্যক্রম দেখিয়া মাসলা-মাসায়েল শিখিবে। মাসলা-মাসায়েলের মাপকাঠিতে পীরের কার্যকলাপকে বিচার করিবে না।
মোরাকাবা হালতে বা স্বপ্নযোগে বা কাফে” অলৌকিক কিছু দেখিলে প্রয়োজনে ইহার তাৎপর্য পীরের নিকট হইতে জানিয়া লইবে। কখনও নিজের স্বপ্ন বা কাশফের উপরে নির্ভর করিবে না। যদি কর, তাহা হইলে লাইনচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। স্বপ্নে বা মোরাকাবার মাধ্যমে পীরের তরফ হইতে কোন নেয়ামত পাইলে কখনও পীর ভিন্ন অন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবে না।
স্বপ্নে, মোরাকাবায় বা দিব্যদৃষ্টিতে পীরের দয়ায় এমন বহু আশ্চর্য তত্ত্ব মুরীদের নিকট প্রকাশ পাইতে পারে যাহা সাধারণ জ্ঞান বা বোঝাবুঝির পরিপন্থী। এমন কোন তত্ত্ব আদৌ কাহারো নিকট প্রকাশ করিবে না। যদি কর, লোকে তাহা না বুঝিতে পারিয়া তোমাদেরকে পাগল বলিবে। (ধারাবাহিক).......








