Logo

খোদাপ্রাপ্তির পথে পীরের দয়ায় বহু তথ্য ও তত্ত্ব প্রকাশ পাইবে

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৮ জুন, ২০২৬, ১৯:৩৫
খোদাপ্রাপ্তির পথে পীরের দয়ায় বহু তথ্য ও তত্ত্ব প্রকাশ পাইবে
ছবি: জনবাণী।

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত আদাবুল মুরীদ। بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

বিজ্ঞাপন

নসিহত নং ২ এর শেষ অংশ: একদা কোন এক বাদশাহ তাহার একমাত্র পুত্রকে লইয়া সাগর ভ্রমণে বাহির হইলেন। পিতা এবং পুত্র-দুইজনে সাগরের সৌন্দর্য দেখিয়া বিমোহিত হইলেন। সুবিস্তৃত জলরাশি, উত্তাল তরঙ্গের মাতামাতি, তিমি মাছের সারি বাধিয়া সন্তরণ, কখনও বা বিশাল ভাসমান বরফ খন্ড ইত্যাদি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখিয়া আনন্দিত হইলেন। সাগর ভ্রমণে তাহার আরও আগ্রহ বাদ্ধ পাইল। হঠাৎ রাজপুত্র এক অতি আশ্চর্য দৃশ্য দেখিয়া হতবাক।

তিনি দেখিলেন, সাগরে ভাসমান একটি পদ্ম পাতার উপরে বসিয়া একটি ব্যাঙ মস্ত বড় এক হাতী ধরিয়া গিলিয়া খাইতেছে। পুত্র তৎক্ষণাৎ পিতাকে এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখাইলেন। পিতা পুত্রকে বলিলেন, "বাবা, তুমি যাহা দেখিলে, দেশে ফিরিবার পর কিন্তু কাহারো নিকট এই কথা প্রকাশ করিও না। করিলে তুমি পাগল সাব্যস্থ হইবে।"

বিজ্ঞাপন

ভ্রমণ শেষে বাদশাহ ও শাহজাদা দেশে ফিরিয়া আসিলেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রধান উজির রাজপুত্রকে জিজ্ঞাসা করিলে পুত্র পিতার নিষেধকে অমান্য করিয়া দৃষ্ট অতি আশ্চর্য "ব্যাঙ-হাতীর কিচ্ছা" বলিয়া ফেলিলেন। ফলে আমির উমরা সকলেই বাদশাহজাদাকে পাগল বলিয়া আখ্যায়িত করিল।

কাজেই খোদাপ্রাপ্তির পথে পীরের দয়ায় এমন বহু তথ্য ও তত্ত্ব প্রকাশ পাইবে যাহা সাধারণ বোঝাবোঝির অতীত। এমন তথ্যাবলী কখনই প্রকাশ করিবে না।

পীরের দরবারে নগ্নপায়ে চলিবে। ইহাই মুরীদের জন্য উত্তম। পীরের নিকট মুরীদ সব সময়ই ভিখারী বা মিসকিন। আর মিসকিনকে মিসকিন হালতেই থাকা উচিৎ। হযরত বশির হাফী (রঃ) ছাহেব খ্যাতনামা একজন ওলী ছিলেন। কিতাবে দেখা যায়, তিনি জীবনে কখনও জুতা-সেন্ডেল পায়ে দেন নাই। কেন?

বিজ্ঞাপন

হযরত বশির হাফীর পীর ছিলেন শরীয়ত ও তরিকতের প্রথিতযশা আলেম হযরত হাসান বছরী (রঃ) ছাহেব। হযরত হাসান বছরী (রঃ) ছাহেব যেদিন বশির হাফীকে তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী প্রয়োগ করিয়া ওলীর দরজায় পৌঁছাইয়া দেন; সেদিন বশির হাফির পীর হযরত হাসান বছরী (রঃ) ছাহেব নগ্ন পায়ে ছিলেন। তাই পীরের প্রতি আদব রক্ষার্থে তিনি [বশির হাফী (রঃ)। কোন দিনই আর জুতা-সেন্ডেল পায়ে দেন নাই। পীরের প্রতি এহেন আদব প্রদর্শনের নমুনা দেখিয়া মহান খোদাতায়ালা বশির হাফী (রঃ) এর উপর অতিশয় খুশী হন এবং অত্র এলাকায় সমস্ত পশু পাখী, গরু-ছাগল-ভেড়া ইত্যাদিকে জানাইয়া দেন, যে সমস্ত রাস্তা দিয়া বশির হাফী চলাচল করেন-সে সকল রাস্তার উপর যেন তাহারা মলমূত্র ত্যাগ না করে। তাই কিতাবে দেখা যায় যে, হযরত বশির হাফী (রঃ) যে সকল রাস্তা দিয়া হাঁটিতেন-সে সব রাস্তার উপরে তাঁহার জীবদ্দশাতে কোন পশু পাখী প্রশ্রাব-পায়খানা করে নাই।

পীরের দায়েরাকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা মুরীদের কর্তব্য। এখানে জাকেরান সকল আল্লাহর জেকের করে। মনে রাখিবে, পীরের দরবারের ধুলাবালি আশেকানদের চোখের সুরমা। কাজেই পীরের দরবারের ইজ্জতের খাতিরে তথায় জুতা-সেন্ডেল পায়ে না দেওয়াই উত্তম।

মুরীদ স্বপ্নে, মোরাকাবায় বা কাশফে কখনও কখনও আপন পীর ভিন্ন অন্য কোন পীর বা মাশায়েখ হইতে ফয়েজ আসিতে দেখিয়া থাকে। মুরীদের খেয়াল স্বপ্নে দৃষ্ট পীরের দিকে ধাবিত হয়। যেমন কোন মুরীদ হয়তো কাশফে বা স্বপ্নে দেখিল যে হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব তাহাকে তাইদ-মদদ প্রদান করিতেছেন। ইহার রহস্য বুঝিতে না পারিয়া মুরীদ নিজ পীর হইতে খেয়াল হয়তো হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেবের প্রতি মুতাওয়াজ্জুহ করে। ইহা মুরীদের জন্য পদস্খলনের এক অধ্যায়। ফয়েজ-বরকত, তাইদ-মদদ যেখান হইতেই আসুক না কেন, যে পীর মাশায়েখগণ হইতেই আসুক না কেন-তাহা যে আপন পীর হইতেই আসিতেছে-সেই খেয়াল মুরীদের সব সময়ই রাখা উচিৎ। স্বপ্নে বা কাশফে পূর্ববর্তী যে সাধককেই দেখা যাক না কেন, তাহা মূলতঃ আপন পীরের লতিফার বিকাশ মাত্র। আপন পীরের লতিফা সমূহের কোন কোন লতিফা ঐ রকম পূর্ববর্তী কোন ওলী-আল্লাহর ছুরাতে এমন কি নবীদের ছুরাতেও মুরীদের নিকট দেখা দিতে পারে। কারণ কামেল পীর সকলের সমষ্টি। কামেল পীরের তেত্রিশ (৩৩) কোটি লতিফা আছে। একজন কামেল একই সংগে তেত্রিশ কোটি সাধকের ছুরাতে মুরীদানদেরকে স্বপ্নে বা কাশফে ফয়েজ প্রদান করিতে সক্ষম। ইহাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই। আল্লাহ প্রদত্ত বহু ক্ষমতার মধ্যে ইহা সামান্য এক নিদর্শন।

বিজ্ঞাপন

কাজেই মুরীদ স্বপ্নে যে সাধককেই দেখুক না কেন-তাহা মূলতঃ আপন পীরের লতিফার বিকাশ। স্বীয় পীরের লতিফার প্রকাশকে মুরীদ ভুল করিয়া ভিন্ন সাধক মনে করিয়া থাকে-যাহা মুরীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কাজেই সাবধান! খেয়ালকে সবসময়ই আপন পীরের দিকে রাখিবে।

হযরত মুজাদ্দেদ আলফেসানী (রাঃ) ছাহেব প্রথম খন্ডের ১৪৮ নং মকতুবে এই প্রসংগে বলেন, "স্বীয় পীর ব্যতীত অন্যের রূহানী সাহায্য প্রাপ্তিতে প্রবঞ্চিত হইবে না। যেহেতু উহা স্বীয় পীরেরই লতিফা সমূহের বিকাশ-যাহা উক্ত পীরের আকৃতি ধারণ করিয়া প্রকাশ পাইয়াছে। অতএব একদিকে লক্ষ্য রাখা এই পথের শর্ত।"

মকতুবাত শরীফের তৃতীয় খন্ডের ২০ নং মকতুবে এই বিষয়ে তিনি আরও বলেন, "জানা আবশ্যক যে, দৌলত বা আত্মিক সৌভাগ্য বাহ্যতঃ যে স্থল হইতে লব্ধ হউক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাহাকে স্বীয় পীর হইতে সমাগত বলিয়া বিশ্বাস করিতে হইবে, যেন লক্ষ্যস্থল বিক্ষিপ্ত না হয় এবং আত্মিক কার্যকলাপে ব্যতিক্রম না ঘটে।"

বিজ্ঞাপন

কথিত আছে, একদা হযরত শাহ কুতুবুদ্দিন হায়দার (রঃ) ছাহেবের একজন মুরীদ অতি ক্ষুধার্ত অবস্থায় হযরত শেখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর খানকা শরীফে উপস্থিত হইয়া নিজ পীরের দরবারের দিকে মুখ করিয়া উচ্চস্বরে বলিতে লাগিত, "হে খাজা কুতুবুদ্দিন হায়দার! আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে সাহায্য কর।" এই হাক্ শোনা মাত্রই হযরত শেখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দ্দদী (রঃ) ছাহেব তদীয় এক খাদেমকে উক্ত আগন্তককে পেট ভরিয়া খাওয়াইতে নির্দেশ দিলেন। খাদেম কুতুবুদ্দিন হায়দারের মুরীদকে পেট ভরিয়া আহার করাইলেন। আহার অন্তে আগন্তক হযরত শেখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দ্দদী (রঃ) ছাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করিয়া বরং সে নিজ পীর হযরত কুতুবুদ্দিন হায়দার (রঃ) ছাহেবের দরবারের দিকে মুখ করিয়া আপন পীরের প্রতিই শোকরিয়া প্রকাশ করিল। ইহাতে শেখ শাহাবুদ্দিন (রঃ) এর খাদেম অসন্তুষ্ট হইয়া বলিল, "এমন অকৃতজ্ঞ ফকির তো আমি কখনও দেখি নাই, যে অন্য পীরের আহার ভক্ষণ করিয়া নিজ পীরের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।" ইহা শুনিয়া হযরত শেখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দ্দদী (রঃ) ছাহেব বলিলেন, "বাবা, ঐ ব্যক্তি ফেরেশতা ছিলেন, তোমাদিগকে আদব শিক্ষা দান উদ্দেশ্যে আসিয়াছিলেন।"

খোদাকে পাওয়াই প্রকৃত মুরীদবর্গের একমাত্র কামনা হওয়া উচিত। এই উদ্দেশ্য হাসিল করিতে হইলে মনে খোদাতায়লার প্রেম হাসিল করিতে হইবে। সতত আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকিতে হইবে; এমনভাবে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকিতে হইবে যে আল্লাহ ছাড়া অন্য বিষয়াদির চিন্তা যেন দেলে প্রবেশ করিতে না পারে।

সকল সময় পীরের খেদমতে থাকিয়া মন খোদা প্রেমে উদ্বেলিত করিতে হইবে। সংসর্গই প্রেম সৃষ্টির একমাত্র পথ। কামেল পীরের সংসর্গ ও সান্নিধ্যই আল্লাহতায়ালার প্রেম সৃষ্টির একমাত্র উপায়। কারণ কামেল পীরের চরিত্র আল্লাহপাকের চরিত্রে গঠিত। মাওলানা রুমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন,

বিজ্ঞাপন

এক যামানে ছহব্বতে বা আউলিয়া,

বেহত্তর আয ছাদ সালা তা'আতে বেরিয়া।

অর্থাৎ-"এক মুহূর্ত কোন কামেলের সংস্পর্শে থাকা একশত বৎসরের নফল বেরিয়া ইবাদতের চেয়ে উত্তম।"

বিজ্ঞাপন

পীরের সান্নিধ্যে থাকিতে হইলে নিজের দেলকে সর্বপ্রকার শয়তানী খেয়াল ও কুপ্রবৃত্তি হইতে সতর্ক ও পবিত্র করিতে হইবে। প্রেমের আকর্ষণ দ্বারা পীরের দেল হইতে খোদাতায়ালার নূর নিজ দেলে লাভ করাই একমাত্র উদ্দেশ্য হইবে। যদি মুরীদ আপন পীরের নিকটে থাকে তবে স্পষ্টতঃ কিম্বা ভাবতঃ মহান কামেল পীর কেবলাজান হুজুরের মত লইয়া নিকটে বসিবে। যদি মুরীদ পীরের নিকট হইতে দূরে থাকে, তাহা হইলে, স্বীয় পীর ছাহেবের পাক তাওয়াজ্জুহ সম্মুখে রাখিয়া ফয়েয লইতে হইবে। আপন পীর কেবলাজান ছাহেবের নিকট হইতে মুরীদ দূরে থাকিলে অনেক সময় অন্য কোন কামেল ব্যক্তির সংসর্গে থাকা দুরস্ত আছে, তবে সে ক্ষেত্রে আপন মুর্শিদে কামেলের অনুমতি অবশ্যই লইতে হইবে। আপন মুর্শিদের অনুমতি ব্যতীত অন্য কোন পীরের বা মুর্শিদের নিকট গমন একান্তই অনুচিত। কারণ মুরীদ বিচার করিতে সক্ষম নহে যে, যে সাধু ব্যক্তির নিকট তিনি গমন করিতেছেন, তিনি প্রকৃতই কামেল কি-না,

অথবা যে মহাত্মার নিকট মুরীদ গমন করিতে ইচ্ছুক তাহার সংগলাভের যোগ্যতা তাহার আছে কিনা? যে সাধু ব্যক্তির নিকট মুরীদ গমন করিতে চাহে, তিনি প্রকৃত কামেল না হইলে মুরীদের কোন লাভ হইবে না। আর মুরাদের দেল যদি প্রকৃত ভাবে প্রস্তুত না হয়, তাহা হইলে আপন পীর নয়, এমন কোন কামেল কলীর নিকট গেলে মুরীদের ভুল-বেয়াদবীর আশংকা রহিয়া যায়। কোন কামেল ব্যক্তির সহিত বেয়াদবী করিলে ক্ষতির আশংকা থাকে। তাই মুরীদ যদি পীরের নিকট একান্তই থাকিতে না পারে এবং দেলে খোদা প্রেম সৃষ্টির জন্য কোন কামেল ব্যক্তির নিকট যাইতে চাহে, তাহা হইলে তাহার পূর্বে আপন মুর্শিদ কেবলাজান ছাহেবের অনুমতি অবশ্যই লইতে হইবে। অনুমতি লইবার পর মুরীদ যদি সেই কামেল ব্যক্তির নিকট হইতে কোন ফয়েজ বা রহমত লাভ করে, তাহা আপন পীরের অসিলায় ও দয়ায়ই লাভ করিয়াছেন বলিয়া মনে করিতে হইবে। কারণ কোন ওলী-আল্লাহ মুরীদের নিজ মুর্শিদে কামেলের সম্মতি ব্যতীত তাহাকে কোন কিছুই প্রদান করিবেন না। তাই আপন পীর কেবলাজান ছাহেবের অনুমতি ছাড়া কোন সাধু বা মহাত্মা ব্যক্তির নিকট যাইয়া কোন লাভ হয় না, বরং ক্ষতির আশংকা থাকে

যে সকল ব্যক্তিবর্গ খোদাপ্রেমী নয়; দুনিয়াবী স্বার্থ ও কর্মে সম্পূর্ণ আসক্ত ও যাহাদের দেলে আল্লাহ ভাবনা নাই; এমন ব্যক্তি হইতে সতত দূরে থাকিবে। উহাদের সংসর্গে খোদাতায়ালার অনুগ্রহ জ্যোতি পতন বন্ধ হয়। দেল উজ্জলতা বিহীন হইয়া কালো আবরণে ঢাকিয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

আপন মুর্শিদে কামেল ছাহেব ও অন্যান্য ওলী-আল্লাহগণ বা মহাত্মা ব্যক্তির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাখিবে। আপন মুর্শিদে কামেলের নাম পারতপক্ষে উচ্চারণ করিবে না; একান্ত প্রয়োজন হইলে অতীব সম্মানের সহিত উচ্চারণ করিবে। অন্যান্য ওলী-আল্লাহগণের নাম উচ্চারণের সময়ও কদাচ আদবের খেলাফ করিবে না।

প্রতি ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সহিত পড়িবে। একবিন্দু পানি ও এক সমুদ্র পানির মধ্যে যে পার্থক্য, একা একা নামাজ পড়া ও জামাতে নামাজ পড়ার মধ্যে সেই পার্থক্য আছে মনে করিবে।

খোদা প্রেম শীতল হইতে পারে এমন কোন চিন্তা মুরীদের জন্য অনিষ্টকর। তাই সেই সকল কর্মে আসক্ত ও ঐ সকল চিন্তায় প্রভাবিত ব্যক্তিবর্গ হইতে তালেবের দূরে থাকা উচিত।

বিজ্ঞাপন

যাহারা পৃথিবীর সম্পদ অর্জন আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্য ও মহব্বত অর্জনের চেয়ে বড় মনে করেন ও সেই অনুযায়ী কর্মে লিপ্ত ও আসক্ত থাকেন, তাহাদের সংসর্গ আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যের পথের পথিকদের জন্য মংগলজনক নয়। পূর্ববর্তী কালের মুর্শিদে কামেলগণ দুইটি বিষয় খোদাতালাশীদের জন্য সব চেয়ে বিপদজনক ও ক্ষতিকর মনে করিয়াছেন। এই দুইটি হইলঃ-ধনীদের সংসর্গ এবং আল্লাহতায়ালার পথ বিচ্যুতি হইয়া বিবাহের চিন্তা করা। সাধকের চোখে অন্য কোন প্রবৃত্তিই ইহা হইতে অনিষ্টকর নয়। কারণ এই সকল প্রবৃত্তি আল্লাহতায়ালার প্রেমাগ্নি শীতল করিয়া তালেবের মনকে ভিন্ন ও বিপরীত দিকে নিবদ্ধ করে। ইহাতে আল্লাহতায়ালার প্রতি প্রেমের বদলে দুনিয়ার প্রতি প্রেম বৃদ্ধি পায়।

আল্লাহতায়ালার পথের পথিকদের সব চেয়ে বড় সম্পদ আদব। বেআদব কখনই খোদাতায়ালার প্রেম লাভ করিতে পারিবে না। যে ব্যক্তির আদব নাই, সে ব্যক্তি কখনও আল্লাহতায়ালার রহমত, করুণা ও দয়া কামনা করিতে পারে না। যে ব্যক্তির আদব নাই, সেই ব্যক্তিই শুধু নয়, তাঁহার সংগীগণও আল্লাহপাকের অনুগ্রহ হইতে দূরে নিপতিত হয়। পীরের প্রতি আদব প্রদর্শনের নিমিত্তে পীরের প্রতিটি হুকুম প্রকৃত মুরীদ পুংখানুপুংখরূপে পালন করিবে।

হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সম্মুখে বসিতে ইচ্ছা করে তাহার কর্তব্য এই যে, সে যেন আল্লাহতায়ালার দোস্তদিগের সহিত বসে।" ইহাতে সেই ফল পাওয়া যাইবে। আল্লাহতায়ালার দোস্তের প্রতি আদব প্রদর্শন করিলে আল্লাহপাক সন্তুষ্ট হইবেন। সুতরাং আপন পীর কেবলাজান ছাহেবের নিকট প্রকৃত মুরীদকে সদাই আদবের সহিত থাকিতে হইবে। স্বীয় পীর কেবলাজান হুজুরের সম্মুখে যতক্ষণ থাকিবে ততক্ষণ মুরীদ পবিত্র হইয়া থাকিবে। স্বীয় মুর্শিদের সম্মুখে যাইবার আগে অজু করিয়া লইবে। মনকে সকল করিবে। আপন মুশিদে কামেলের নিকট বসিতে হইলে তালেব সর্বদা নতশিরে বসিবে। বসিবার একান্ত প্রয়োজন না হইলে মুরীদ আদবের সহিত দন্ডায়মান থাকিবে। স্বীয় পীর কেবলাজানের সম্মুখে কখনই আসন করিয়া বসিবে না।

বিজ্ঞাপন

যতক্ষণ মুর্শিদে কামেলের সম্মুখে থাকিবে মুরীদ অন্য কোন দিকে মন বা দৃষ্টি ফিরাইবে না। কারণ তিনি মুরীদকে উদ্দেশ্য করিয়া উপদেশ দান করিবেন। তাই স্বীয় পীরে কামেলের দিক হইতে দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরাইয়া লওয়া অতি অন্যায় ও অনাকাংখিত কর্ম। স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, মুর্শিদে কামেল মুরীদের মনের অবস্থা সম্পূর্ণ রূপে জ্ঞাত। তাই শুধু বাহ্যিক ভাবেই নয়, পীরে কামেলের নিকটে বা দূরে কোন অবস্থায়ই তালেব কুচিন্তা, কুভাব মনে প্রশ্রয় দিবে না। নাফসে আম্মারার কুপ্রভাবে কখনও এই রূপে খারাপ চিন্তা মনে আসিলে আপন পীরে কামেল ছাহেবের দয়া ও আশ্রয় ভিক্ষা চাহিয়া মন হইতে সকল প্রকার অনিষ্টকর চিন্তা দূরীভূত করিবার প্রয়াস পাইবে ও সংগে সংগে তওবা করিয়া মন অন্য দিকে ঘুরাইয়া লইবার জন্য আপন মুর্শিদ কেবলার দয়া মনে মনে প্রার্থনা করিবে। নাফসে আম্মারার এই প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সতত জেহাদ করিবে। দিক হইতে ফিরাইয়া একমাত্র স্বীয় মুর্শিদের প্রতি সন্নিবেশিত

স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজান হুজুরের দরবারে অবস্থান কালে পীর কেবলাজান ছাহেবের সম্মুখে নিয়ম অনুযায়ী বিনীতভাবে খেদমতের বাসনা লইয়া দন্ডায়মান হইবে। তবে এমন সময়ে পীর ছাহেব কেবলাজানের নিকট গমন করিবে না, যখন ইহাতে তিনি কষ্ট পাইতে পারেন বা বিরক্ত হইতে পারেন।

স্বীয় পীর কেবলাজান ছাহেবের নিকটে উপস্থিত হইয়া পীর কেবলাজান হুজুরের বিনা আদেশে কোন কিছু করা এমন কি জেকের-আজকার করাও নিষেধ। স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজানের নিকট দাঁড়াইবার সময়ে এমনভাবে দাঁড়াইবে যাহাতে নিজের ছায়া স্বীয় পীর ছাহেব কেবলার ছায়ার উপর বা তদীয় পরিধেয় বস্ত্রের উপর না পড়ে। পীর ছাহেব কেবলাজান যে স্থানে উপবিষ্ট বা দন্ডায়মান থাকেন তালেব তাহা হইতে উচ্চ স্থানে উপবিষ্ট বা দন্ডায়মান হইবে না।

মুরীদ যখন স্বীয় মুশিদ কেবলা ছাহেবের পশ্চাতে অনুগমন করিবে, তাহাকে খেয়াল করিতে হইবে যে পীর কেবলাজান ছাহেবের পদচিহ্নের উপর যেন তদীয় পদ পতিত না হয়। স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজানের ব্যবহৃত কোন বস্ত্র বা বস্তু নিজে করিবার স্থানে মুরীদ ওজু গোসল করিবে না। স্বীয় পীর ছাহেব ব্যবহার করিবে না। স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজানের ওজু-গোসল কেবলাজানের বসিবার স্থানে বা বিছানায়, কিম্বা নামাজের মসলায় বা পাটিতে কখনই বসিবে না বা নামাজ পড়িবে না। ঐ সকল স্থান সমূহে যাহাতে কোন অবস্থাতেই মুরীদের পা না লাগে সে দিকে সর্বদা খেয়াল রাখিবে।

পীর কেবলাজান হুজুরের দায়রা বা হোজরা মোবারকের দিকে পিছন করিয়া বা সেই দিকে মুরীদ পা দিয়া বসিবে না, ঐ দিকে থুথু ফেলিবে না। আপন পীর কেবলাজান হুজুরের সম্মুখে মুরীদ কখনও আহার করিবে না। কিন্তু স্বীয় পীর কেবলাজান ছাহেবের আদেশ হইলে মুরীদ ঐরূপ আহার গ্রহণ করিতে পারে।

স্বীয় পীর কেবলাজান হুজুরের কোন কার্যকে মন্দ জানিবে না। মুরীদের জন্য ইহা অপেক্ষা অনিষ্টকর অন্য কোন কিছুই নাই। স্বীয় পীর কেবলাজান ছাহেবের কোন উক্তি বা কর্মের কারণ পরিস্কার না হইলেও মুরীদকে তাহাই সর্বোত্তম জানিতে হইবে কারণ মুর্শিদে কামেল মাকাম-মঞ্জিল ও শরীয়তের খুঁটিনাটি সকল বিষয়ে সর্বোত্তম ভাবে জ্ঞাত। শুধু তাহাই নহে, মুর্শিদে কামেলগণ আল্লাহতায়ালার এলহাম দ্বারা পরিচালিত হইয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ও উপদেশ দান করেন।

হযরত মুসা (আঃ) যেরূপ হযরত খিজির (আঃ) এর কর্মের তাৎপর্য বুঝিবার জন্য জিজ্ঞাসা করিয়া পরে তাহার মর্ম উপলব্ধি করিয়াছিলেন, সেই রূপ মুরীদের নিকট যদি স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজান হুজুরের কোন কর্মের কারণ স্পষ্ট না হয় তাহার মর্ম মুরীদ স্বীয় মুর্শিদ কেবলাজানের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া লইতে পারেন। ইহাতে তাহার সংশয় দূর হইবে। স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজান হুজুরের কোন কর্মে সংশয় রাখাই মুরীদের জন্য অনুচিত ও উহা ঘোর বেয়াদবী তাহা মনে রাখিতে হইবে। স্বীয় পীর কেবলাজানের প্রতি ভক্তি ও সন্দেহাতীত বিশ্বাসই আল্লাহপাকের পথের পথিকদের একমাত্র সহায় ও সম্বল। সুতরাং সংশয় তাহার ঠিক বিপরীত। সহস্র মন তুলা যেমন আগুনের স্বীয় পীর ছাহেব কেবলাজানের কোন কর্ম বা উক্তি সম্পর্কে একটি মাত্র স্কুলিংগ ধ্বংস করিতে পারে, একই রূপে সন্দেহ ও সংশয়ের বিন্দুমাত্র স্ফুলিংগ পীর ছাহেব কেবলাজানের উপর ভক্তি ও ঈমান নষ্ট করিয়া দিতে পারে।

অতএব পীর কেবলাজান হুজুরের কোন কর্মে কোন প্রকার সংশয় মনে জায়গা দিবে না। কোন প্রকার সন্দেহ বা সংশয় মন হইতে দূর না হইলে স্বীয় পীর কেবলাজান হুজুরের নিকট তাহা বিনীতভাবে ও আদবের সহিত উত্থাপন করিয়া সন্দেহ ভঞ্জন করিয়া লওয়া দুরস্ত আছে। ডাক্তারের নিকট যেমন রোগ গোপন করিয়া লাভ হয় না, আপন মুর্শিদ কেবলার নিকট সেই রূপে কোন প্রকার মানসিক অবস্থা চাপিয়া রাখিয়া লাভ হয় না। কারণ তিনি মুরীদের মনের সকল অবস্থাই অবগত থাকেন। মুরীদ যাহা বুঝিবে না তাহা স্বীয় পীর কেবলাজানকে জানাইবে। সকল কর্ম স্বীয় পীর ছাহেব কেবলার অনুকরণে করার জন্য মুরীদের চেষ্টা থাকা উচিত। প্রতি কর্ম পীরের অনুকরণে করায় অধিক ফল প্রাপ্তির সম্ভাবনা জানিবে। আমার পীর কেবলাজান বলিয়াছেন, "পীরের খাসলতে খাসলত ধর, তবেই ত্রাণ ও শান্তি"। কামেল মুর্শিদবর্গ সতত আল্লাহপাকের এলহাম অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করেন, তাই তাহাদের কর্মসমূহ নির্ভুল হয়। এই জন্য পীরে কামেলবর্গের অনুকরণে কর্ম সম্পাদন নির্ভুল হয় বলিয়া জানিবে। তাহাতে আল্লাহতায়ালার অনুমতি ও সন্তুষ্টি থাকে বলিয়া জানিবে।

পীর হইতে কোন কারামতি দেখিবার ইচ্ছা কোন মুরীদের পোষণ করা উচিত নহে। কারামতি কাফের ও শত্রুদের জন্য, মুমিনদের জন্য নহে। হযরত আবুবকর ছিদ্দিক (রাঃ) হযরত রাসূলে করীম (সঃ) এর সকল আসহাবদিগের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও অগ্রগন্য। তিনি হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এর নিকট হইতে কোন মোজেজা দেখিতে চাহেন নাই। পীরের কারামতি মুরীদ বা তালেব সর্বক্ষণ তাহার দেহের মধ্যে অনুভব করিয়া থাকেন। অতএব সর্বাবস্থায় আদব, ভক্তি ও খেদমতের মাধ্যমে স্বীয় পীর কেবলাজান হুজুরের সন্তুষ্টি ও মহব্বত অর্জনের চেষ্টা করিবে ও সেই চেষ্টাকেই মাঞ্জিলে মাচুদে পৌঁছাইবার চাবি কাঠি জানিবে।

মুরীদ সকল সময়ে নিজেকে অপরাধী ও অপারগ মনে করিবে, তাহা হইলেই পীরের সম্মুখে বিনীতভাব মনে উপস্থিত হইবে। মুরীদ যদি বাস্তবিকই অপারগ ও অক্ষম হয়; তাহা হইলেও পীরের খেদমত ত্যাগ না করিয়া নিজেকে সংশোধন করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিবে। এই উপদেশ হযরত আব্দুল্লাহ্ আহরার (রঃ) ছাহেব (যিনি হযরত জামী (রহঃ) এর পীর ছাহেব কেবলা) ও আমাদের তরীকার ইমাম হযরত মুজাদ্দেদ আলফেছানী (রাঃ) ছাহেবের আদিষ্ট বাক্য বলিয়া জানিবে।

আপন পীরের নিকট হইতে মুরীদ শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান ও তাৎপর্য শিক্ষা করিবে। কারণ মুর্শিদে কামেলই শরীয়তের পূর্ণ ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও ভেদ অবগত। বিভিন্ন প্রকার কিতাবে লিখিত শরীয়ত সম্পর্কে ব্যাখ্যা অনেক সময় মুরীদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিতে পারে। তাই শরীয়তের সঠিক দিক্ নির্দেশনা পীরে কামেলের নিকট শিক্ষা করাই উত্তম। কারণ তিনি স্বয়ং আল্লাহপাকের এলহাম দ্বারা শরীয়তের ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

এই স্থানে স্মরণ রাখা কর্তব্যঃ (১) এরাদতের পীর, (২) শিক্ষা-পীর ও (৩) খেলাফতের পীর-এই তিন প্রকারের পীরকেই সমানভাবে সম্মান, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আদব প্রদর্শন করিতে হইবে। এরাদতের পীর অর্থাৎ যাঁহার নিকট কেবল মাত্র মুরীদ হওয়া যায়। শিক্ষা-পীর অর্থাৎ যাহার নিকট হইতে মুরীদ ছুলুক" শিক্ষা করেন। খেলাফতের পীর অর্থাৎ যিনি লোকদিগকে শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাত জ্ঞান সম্পূর্ণ শিক্ষা দানের পর অন্যকে শিক্ষা দানের নির্দেশ দেন।

তবে কোন ব্যক্তি যদি কোন পীরের নিকট সামান্য শিক্ষা করিয়া এবং শিক্ষা সমাপ্ত না করিয়া অন্য পীরের নিকট হইতে খেলাফত গ্রহণ করে, তবে যে পীর খেলাফত দান করিয়াছেন তাহাকে খেলাফতের পীর বলা যাইবে না এবং ঐ তালেবকেও মুরীদ করার যোগ্য বুঝিতে হইবে না।

ইহা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে শিক্ষা-পীরই মূলতঃ খোদা নির্দেশক। তাই খোদা নির্দেশক পীরের সহিত কোন প্রকার বেয়াদবী হইলে মারেফাত জ্ঞানে বিঘ্ন ঘটে।

মানুষ ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়াবী জীবন মাতাপিতার মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়। মাতা পিতাই মানব শিশুকে লালন-পালন করিয়া বড় করিয়া তোলেন। মাতাপিতার লালন পালনেই শিশু তাহার শৈশব ও কৈশোর অতিক্রম করিয়া যৌবনে পা দেয়।

অন্য দিকে পীরের প্রতিপালনে মানুষ চিরস্থায়ী জীবনের সন্ধান পায়। পীরের তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদীর বলে মুরীদের মুর্দা দেল জিন্দা হয়, দেল ১৪-ই রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জল হয়। শুধু তাই নয়-পীরের প্রতিপালনে মুরীদ কোটি কোটি নূরের বাল্ব প্রজ্জলিত "তৌহিদে ওজুদী" নামক এক নুরের দেহ প্রাপ্ত হয়-যে দেহের আর মৃত্যু নাই। মুরীদ চির অমরত্ব লাভ করে

পিতামাতার প্রতি আদব প্রসংগে আল্লাহপাক বলেন,

وَ قَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا طَ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كلاهُمَا فَلاَ تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍّ و لا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا

قَوْلاً كَرِيمًا

অর্থাৎ-"তোমার প্রতি নির্ধারিত হইয়াছে-ইবাদত করিবে না তাহাকে ব্যতীত; সদাচারণ করিবে পিতামাতার সহিত; তাহাদের একজন কিংবা উভয়ে বার্ধক্যে পৌঁছাইলে তাহাদের উদ্দেশ্যে উহ্ শব্দটুকু বলিবে না এবং না তাহাদিগকে ধমক দিবে, বরং কথা বলিবে আদবের সাথে।" (সূরা বনি ইসরাইলঃ আয়াত নং ২৩ ও ২৪)

যে পিতামাতার অছিলায় ক্ষণস্থায়ী জীবন পাওয়া যায় তাহাদের প্রতিই এত অধিক আদব রক্ষা করিয়া চলিতে হয়; আর যে রুহানী পিতার মাধ্যমে মুরীদ চিরস্থায়ী জীবন পায় তাহার প্রতি কিরূপ আদব রক্ষা করিয়া চলা কর্তব্য তাহা চিন্তা করিয়া দেখ।

একদা সুলতানুল মাশায়েখ হযরত নেজামুদ্দিন বদাউনী তদীয় কতিপয় মুরীদানসহ উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একটি কুকুর নিকটস্থ পথ দিয়া যাইতেছিল। কুকুরটিকে দেখামাত্রই হযরত নেজামুদ্দিন বদাউনী (রঃ) ছাহেব দাড়াইয়া গেলেন। কিছুক্ষণ বাদে পুনরায় বসিলেন। মুরীদানেরা জিজ্ঞাসা করিল, "হুজুর! একটি কুকুরকে দেখিয়া এমন তাজিমের” হেতু কি?” উত্তরে তিনি বলিলেন, "আমার পীরের দরবারে একটি কুকুর ছিল। এইমাত্র রাস্তা দিয়া অতিক্রমকারী কুকুরটি দেখিতে হুবহু আমার পীরের দরবারের সেই কুকুরের অনুরূপ। তাই ইহার সম্মানার্থে আমি দাঁড়াইয়াছিলাম।" আপন পীরের প্রতি উক্তরূপ আদব প্রদর্শনের কারণেই আল্লাহপাক তাহাদেরকে মারেফাতের আকাশে উড্ডয়নের ক্ষমতা দিয়াছেন।

আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব "শলপ" স্টেশন হইয়া কোলকাতায় যাইতেন। আবার কোলকাতা হইতে "শলপ" স্টেশন হইয়াই দেশে আসিতেন। ঐ শলপ স্টেশন আমার পীর কেবলার পরশে ধন্য ছিল।

পীর কেবলার নির্দেশে আমাকে মাঝে মাঝে কোলকাতায় যাইতে হইত। আমিও উক্ত স্টেশন হইয়া কোলকাতায় যাইতাম। স্টেশনের নিকটবর্তী হইয়া প্রথমেই স্টেশনকে অভিনন্দন জানাইতাম, ছালাম দিতাম। বলিতাম, হে শলপ স্টেশন! তুমি জামানার শ্রেষ্ঠতম মুজাদ্দেদ খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পদধূলি পাইয়া ধন্য। তাঁহার খেদমত করিতে পারিয়া তুমি গর্বিত। তোমার অবয়বে সেই আনন্দের আভাই ফুটিয়া উঠিয়াছে। তুমি এই মিছকিনের ছালাম গ্রহণ কর। অভিনন্দন নাও। কোলকাতা হইতে ফিরিবার পথে স্টেশনের নিকটবর্তী হইয়া আবার শলপ স্টেশনকে অভিবাদন জানাইতাম, ছালাম দিতাম।

নির্জীব ও অচেতন পদার্থ যে ওলী-আল্লাহদের খেদমতে অতিশয় খুশী হয় তাহার একটি দৃষ্টান্ত তুলিয়া ধরিতেছি। ওলীয়ে কামেল হযরত মোহাম্মদ মুবারক (রঃ) বলিয়াছেন যে, একদা আমি হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেবের সংগে বায়তুল মোকাদ্দাসের ময়দানে ছিলাম। মধ্যাহ্নিক বিশ্রামের সময় আমরা একটি আনার গাছের নীচে অবতরণ করিলাম এবং কয়েক রাকায়াত নামাজ পড়িলাম। আমি আনার গাছটি হইতে আওয়ায শুনিতে পাইলাম, হে ইব্রাহিম আদহাম! আমাকে সম্মানিত করুন এবং আমার কিছু ফল ভক্ষণ করুন। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব মস্তক সম্মুখের দিকে নত করিলেন। গাছটি তিনবার. উপরোক্ত রূপ বলিল, অতঃপর আমাকে বলিল, হে আবু মোহাম্মদ!

আপনি ইব্রাহিম আদহামকে একটু সুপারিশ করুন, তিনি যেন আমার ফল ভক্ষণ করেন। আমি ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) কে বলিলাম, হে আবু ইসাহাক! আপনি কি এই গাছটির আবেদন শুনিতেছেন? তিনি বলিলেন, শুনিতেছি। এই বলিয়া তিনি দাঁড়াইলেন এবং গাছ হইতে দুইটি আনার ছিঁড়িয়া একটি আমাকে দিলেন এবং অপরটি নিজে খাইলেন। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেবকে খাওয়াইতে পারিয়া গাছটিও ধন্য হইল, সম্মানিত হইল। ঠিক তেমনি "শলপ স্টেশন" আমার পীর কেবলাজানের পদধূলি বক্ষে ধারণ করিয়া সম্মানিত হইয়াছিল। তাই কোলকাতায় যাওয়া আসার সময় আমি শলপ স্টেশনের নিকটবর্তী হইতে না হইতেই দন্ডায়মান হইয়া ইহাকে ছালাম দিতাম।

কামেল পীর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ওলী-আল্লাহগণ বহু খোঁজাখুজির পর কামেল পীরের সন্ধান পাইয়াছেন। কিন্তু এই মিছকিনকে তাহা করিতে হয় নাই। জামানার শ্রেষ্ঠতম মুজাদ্দেদ, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব নিজেই পালকিতে করিয়া আমাদের বাড়ীতে গমন করিয়াছিলেন আমাকে এবং আমার বড় ভাইকে আনয়নের জন্য। আমার আব্বাজানের নিকট চাওয়া মাত্রই তিনি আমাদের দুই জনকে (অর্থাৎ আমাকে এবং বড় ভাই মোঃ আলতাফ হোসেন) সানন্দে পীর কেবলার কদমে সোপর্দ করিলেন। সেই হইতেই আমার দেল পীর কেবলার প্রতি মুতাওয়াজ্জুহ ছিল। দশ বছর বয়স হইতে পীরের কদমে আমার খেদমত শুরু হয়। মাঝে মাঝে বাড়ীতে আসিতাম, কোলকাতায় যাইতাম। কিন্তু মন পড়িয়া থাকিত পীর কেবলার কদমে। কেবলাজান হুজুরকে না দেখিলে মোটেই ভাল লাগিত না।

দরবারে খেদমতরত অবস্থায় তিনি আমাকে নামে মাত্র সামান্য পরিমানে খাবার দিতেন। ফলে ক্ষুধাজনিত দুর্বলতায় আমি শুকাইয়া যাইতাম। আমার হাঁটিতেও কষ্ট হইত। কিন্তু প্রতিদিন সকালে যেইমাত্র পীর কেবলার নূরানী চেহারা মোবারক দেখিতাম, তৎক্ষণাৎ ক্ষুধার জ্বালার কথা ভুলিয়া যাইতাম।

যখন হইতে পীর কেবলাজানের খেদমত আমার নছিব হইয়াছে, তখন হইতে দুনিয়ার কোন কিছুর প্রতি মন আমার লাগিত না। সর্বক্ষণই মন-প্রাণ থাকিত পীরের দিকে। তাই পীর কেবলাজান আমাকে কবুল করিলেন। বলিলেন, "তোমার দাদা পীর (হযরত ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেব) যেমন তদীয় কদমের নীচে আমাকে জায়গা দিয়াছিলেন, আমিও তেমন তোমাকে আমার কদমের নীচে রাখিয়া দিলাম।” এই পথে কামেল পীরই হইল প্রধান মাধ্যম। পীরের কবুলিয়ত পাইলে সংগে সংগে আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি মিলে। এক মুহূর্তও আর বিলম্ব হয় না। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তাই বলেন,

"চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল

হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।"

অর্থাৎ-যেইমাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসাবে, রাসূল (সাঃ) তোমাকে উম্মত হিসাবে কবুল করিলেন; আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ হইতে তখনই তুমি স্বীকৃতি পাইলে, যখন আপন পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে। কাজেই, মূল কথাই হইল পীরের কবুলিয়ত অর্জন। সেই উদ্দেশ্যে পীরের দিকে মন-প্রাণ মুতাওয়াজ্জুহ রাখিতে হয়-যাহা শ্রেষ্ঠতম আদব।

একদা কোন কামেলের এক মুরীদ জাহাজে করিয়া কোথাও যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ জাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়িয়া জাহাজটি তলাইয়া যায়। সেই মুরীদও পানিতে তলাইয়া যাইতে থাকে। এমন সময় একটি জ্যোতির্ময় হাত তাহার দিকে আসিতে দেখে এবং অদৃশ্য হইতে আওয়াজ হয়-"তুমি এই হাত ধর। তোমাকে তীরে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে।" মুরীদ জিজ্ঞাসা করিল, "ইহা কাহার হাত?" আওয়াজ হইল, "ইহা আল্লাহতায়ালার কুদরতী হাত।" মুরীদ বলিল, "আমি আল্লাহর কুদরতী" হাত চিনি না। কাজেই এই হাত আমি ধরিব না।" হাত উঠিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ আর একটি হাত তাহার দিকে প্রসারিত হইল। আওয়াজ হইল, "এই হাত ধরিলে তোমাকে তীরে উঠাইয়া দেওয়া হইবে।" মুরীদ জানিতে চাহিল, "ইহা কাহার হাত?" উত্তর হইল, "ইহা নবী করীম (সাঃ) এর হাত।" মুরীদ বলিল, "আমি কখনও নবী করীম (সাঃ) কে দেখি নাই। তাহার হাতকেও আমি চিনি না। তাই এই হাত আমি ধরিব না।" সংগে সংগে হাত উঠিয়া গেল। আর একটি হাত তাহার দিকে প্রসারিত হইল। বলা হইল, "এই হাত ধর। তোমাকে নির্ঘাত পারে উঠাইয়া দেওয়া হইবে।" মুরীদ জিজ্ঞাসা করিল, "ইহা কাহার হাত?" আওয়াজ হইল, "তাকাইয়া দেখ। ইহা তোমার পীরের হাত।" মুরীদ তাকানো মাত্রই পীরের হাতকে চিনিতে পারিয়া ধরিয়া ফেলিল। আল্লাহপাকের কৃপায় মুরীদ আসন্ন মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা পাইল।

হযরত মঈনুদ্দিন চিশতি (রঃ) ছাহেবের মুরীদ ছিলেন হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এবং হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এর মুরীদ ছিলেন হযরত শেখ ফরিদ (রঃ)। একদা হযরত মঈনুদ্দিন চিশতি (রঃ) কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এর খানকায় আসিলে হযরত কাকী (রঃ) তাঁহাকে কদমবুছি করিলেন। হযরত কাকী (রঃ) এর মুরীদানেরাও তাঁহাকে কদমবুছি করিলেন। কিন্তু একমাত্র হযরত শেখ ফরিদ (রঃ) চিশতি (রঃ) কে কদমবুছি করিলেন না। তিনি বরং আপন পীর হযরত কাকীকেই (রঃ) কদমবুছি করিলেন। ইহা দৃষ্টে হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) ছাহেব ফরিদকে ধমক দিয়া বলিলেন, "আমার পীর জামানার নূর। সকলেই তাঁহাকে কদমবুছি করিল। তুমি করিলে না কেন?" তৎক্ষণাৎ হযরত চিন্তি (রঃ) শেখ ফরিদের কপালে চুম্বন দিয়া কুতুবুদ্দিন কাকীকে (রঃ) উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, "হে কুতুবুদ্দিন! তোমার মুরীদানদের মধ্যে একমাত্র শেখ ফরিদই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের যোগ্যতা লাভ করিয়াছে। তাঁহার লক্ষ্য কেবল পীরের দিকেই।"

কাজেই হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা তোমাদের দেলকে সর্বদাই পীরের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ রাখ। মনে-প্রাণে খেদমত করিতে থাক। যে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হইল, সেই অনুযায়ী যদি চলিতে পার, তবে খোদাপ্রাপ্তিজ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে-তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তোমরা কামিয়াবী হও, আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। দু'আ ইতি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD