বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে মেসি, সম্পদের দৌড়ে এখনও এগিয়ে রোনালদো?

ফুটবল মাঠে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার আলোচনায় এসেছে সম্পদের অঙ্ক নিয়েও। আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি সম্প্রতি বিলিয়নিয়ার ক্রীড়াবিদদের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও সম্পদ বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের অল্প কয়েকজন সক্রিয় ক্রীড়াবিদের একজন, যারা খেলোয়াড়ি জীবন চলাকালীন এক বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে প্রশ্ন উঠেছে—মেসি কি এখন তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়েও ধনী? উত্তরটি সংক্ষিপ্তভাবে ‘না’ হলেও, দুই তারকার সম্পদ গড়ে ওঠার গল্প একেবারেই ভিন্ন এবং সেখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
মেসির সম্পদের ভিত্তি তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ আয় করার মাধ্যমে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ফুটবলারদের একজন হিসেবে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে তার আয় বড়ভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় তার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এরপর বার্সেলোনার জার্সিতে কাটানো স্বর্ণালী সময়ে তার আয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর তার পারিশ্রমিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, শুধু একটি মৌসুমেই তিনি শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মেসির বিলিয়নিয়ার হওয়ার পেছনে কোনো একক চুক্তি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে অর্জিত বেতন, বোনাস, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং বিনিয়োগের সমন্বিত প্রভাব কাজ করেছে।
বিজ্ঞাপন
মেসির সম্পদের গল্পে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো সৌদি আরবের একটি ক্লাবের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। তাকে বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলে তিনি আরও আগেই বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হতে পারতেন।
কিন্তু অর্থের চেয়ে ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, ক্লাবটির বাণিজ্যিক মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। মেসির আগমনের আগে ক্লাবটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ে সেই মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
বিজ্ঞাপন
তার বর্তমান চুক্তির একটি বিশেষ দিক হলো, খেলোয়াড়ি অধ্যায় শেষ হওয়ার পর তিনি ক্লাবের মালিকানার অংশ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে ভবিষ্যতেও এই ক্লাব থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেসির সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম বড় উৎস তার বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো। বর্তমানে বিশ্বের বেশ কয়েকটি শীর্ষ ব্র্যান্ডের সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব রয়েছে। ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের সঙ্গে তার আজীবন চুক্তি সবচেয়ে আলোচিত।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবা, পানীয় ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক পণ্যের দূত হিসেবেও তিনি কাজ করছেন। মাঠের বাইরের এই আয়ের ধারা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফুটবল ক্যারিয়ারের বাইরে ব্যবসা ও বিনিয়োগেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন মেসি। স্পেনে তার রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি হোটেল ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। এ ছাড়া তিনি নিজস্ব ফ্যাশন ও পোশাক ব্র্যান্ড চালু করেছেন এবং খুচরা বিক্রয় ব্যবসাতেও বিনিয়োগ করেছেন।
ফুটবলের বাইরেও তার বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বিস্তৃত হওয়ায় আয় ও সম্পদের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেসি ফুটবল ক্লাব মালিকানার দিকেও মনোযোগ দিয়েছেন। উরুগুয়েতে একটি ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তিনি অংশ নিয়েছেন, যেখানে তার দীর্ঘদিনের সতীর্থ লুইস সুয়ারেজও যুক্ত আছেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর এসব ব্যবসা ও ক্রীড়া বিনিয়োগ তার সম্পদ আরও বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মেসি বিলিয়নিয়ার হলেও সম্পদের দিক থেকে এখনও এগিয়ে আছেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, রোনালদোর মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেওয়ার পর তার বার্ষিক আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। করমুক্ত বিপুল অঙ্কের চুক্তি তাকে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ক্রীড়াবিদদের শীর্ষে নিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতেও রোনালদোর বার্ষিক আয় কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের ঘরেই থাকবে।
রোনালদোর সম্পদের বড় অংশ এসেছে সাম্প্রতিক সময়ের অত্যন্ত উচ্চমূল্যের চুক্তি থেকে। অন্যদিকে মেসি দীর্ঘমেয়াদি বেতন, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, স্পনসরশিপ, ব্র্যান্ড মূল্য এবং মালিকানা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ফলে মেসির সম্পদের উৎস তুলনামূলকভাবে বেশি বৈচিত্র্যময় বলে মনে করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ব ক্রীড়াবিদদের আয়ের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাঠের বাইরের আয় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্পনসরশিপ, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরশিপ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়াবিদরা এখন শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ক্রীড়াবিদদের জন্য মাঠের পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা, আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়, রেকর্ডসংখ্যক ব্যালন ডি’অর অর্জন এবং পরবর্তীতে সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগ—সবকিছু মিলিয়ে লিওনেল মেসি এখন শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন। তিনি বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির অন্যতম সফল মুখ, যার প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের জগতেও বিস্তৃত। আর বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে তার প্রবেশ সেই দীর্ঘ যাত্রারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।








