Logo

পুলিশ কী? স্বেচ্ছাচারী-সেবক? না কি হুকুমের গোলাম?

profile picture
কাজী শুভ্র রহমান
৮ জুন, ২০২৬, ১১:৫৭
পুলিশ কী? স্বেচ্ছাচারী-সেবক? না কি হুকুমের গোলাম?
ছবি: সংগৃহীত

শুরুতেই বলে রাখি পুলিশ খারাপ না। ঘর থেকে দু পা বাড়ালেই শোনা যায় পুলিশের বদনাম। পুলিশের বদনাম শুনতে শুনতে অমরা বড় হয়েছি। শিরোনামের চারটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। ১৯৯২ সাল তখন চুয়াডাঙ্গার এসপি ছিলেন আব্দুর রহিম বিপিএম।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় পুলিশ সপ্তাহের সমাপনি অনুষ্ঠানে আয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। জেলা শিল্পকলা একাডেমরি পক্ষ থেকে আমরা একাধিক শিল্পি ছিলাম আমন্ত্রিত। কে কোন গান পরিবেশন করবেন তার মহড়া চলেছে নিয়মিত। আমার ছিল লোকসংগীত। তবে আমি কী গান গাইব তা প্রকাশ করি নাই। পুলিশের বদনাম শুনে বড় হলেও আমি পুলিশের পক্ষে। তবে সত্য বলতে কি হাজারো পুলিশের মধ্যে দু’একজন খারাপ থাকতে পারে তারা কখনো সফলতা পায় না । আছে বিভাগীয় শাস্তি। যাই হোক অনেকেই গাইলেন। এলো আমার পালা। শুরু করলাম এভাবে:-

যত দোষ নন্দ ঘোষ

কে বলেছে কথাটা

বিজ্ঞাপন

আসলে পুলিশ বাবু

লোকটা মন্দ না

যদি না পুলিশ থাকে

বিজ্ঞাপন

দেশটা কি সুস্থ্য থাকে

এ কথা ভাবতে গেলে

ঘুম আসে না

বিজ্ঞাপন

গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রধান অতিথি ডিআইজি লুৎফুল কবির উঠে দাঁড়িয়ে হাত তালি দিতে লাগলেন সেই সাথে পিছনে বসা শতাধিক পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে গেলেন। তালি যেন থামে না। ডিআইজি সাহেব মঞ্চে উঠে এসে বললেন-চাকরির শুরু থেকে শুনে আসছি পুলিশ খারাপ। গানে গানে সুরে সুরে এই প্রথম শুনলাম পুলিশ খারাপ না। এরপর পরের ঘটনা নাই বা বলি। বুদ্ধি হয়ে পর্যন্ত শুনে আসছি পুলিশ হাজারো ভাল কাজ করলেও একটায় সংলাপ পুলিশ খারাপ। অথচ অসংখ্য পেশায় আছে লাখো কোটি খারাপ মানুষ, অসৎ মানুষ, দুর্নীতিবাজ। আর সেই দুর্নীতিবাজদেরকে রুখতে প্রয়োজন হয় পুলিশের। মজার ঘটনা সেই সকল কুৎসিৎ লোকদেরকে ছাড় করতে, মামলা ওঠাতে ফোন আসে উপর মহল থেকে, চাপ সৃষ্টি করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। আসামি ছাড়তে দেরি হলে ঘেরাও হয় থানা, ভাংচুর হয় জাতীয় সম্পদ। পুলিশ হয়ে পড়ে অসহায়। এখানেই শেষ নয় গায়ে হাত তোলা হয় পুলিশের। এখন আপনারাই জবাব দিন আমার প্রথম প্রশ্নের-পুলিশ কী?

নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নিজেদের স্বার্থে পুলিশ প্রথা প্রবর্তন করলেও বর্তমান একবিংশ শতাব্দিতে এসে প্রতিয়মান হয় যে, পুলিশ ছাড়া জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। পুলিশ ছাড়া সামাজিক শান্তি বিলীন হয়ে যায় নিমিষেই। পুলিশ ছাড়া বেড়ে যায় সমাজে দুর্বৃত্তায়ন। যার জ্বলন্ত প্রমাণ দেখেছি ২০২৪ খৃষ্টাব্দের ৫ই আগষ্ট এবং পরবর্তী সময়ে। ৫ই আগষ্টে স্বচোক্ষে দেখেছি সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবনসহ শতাধিক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে লুট হতে, চুরি হতে, আগুন লাগাতে, দেখেছি পুলিশ ছাড়া নৈরাজ্যকে কিভাবে দেশের অধিকাংশ জনতা লালন করে। দেখেছি পুলিশ না থাকলে কি ভাবে দেশের কলিজা খাবলে খাবলে খায় এদেশের স্বার্থবাদিরা। পুলিশ ছাড়া শেখ হাসিনা পতনের নামে যে নৈরাজ্য দেখেছি তা ১৯৭১ এ দেখেছি। ‘৭১ এর ২৫ শে মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নিরস্ত্র, ঘুমন্ত প্রায় ৮ শতাধিক পুলিশকে হত্যা করে পাক সেনারা। পাশাপাশি দেখলাম ২০২৪ এর স্বৈরাচার খেদাও আন্দোলনে কিভাবে আগুনে পুড়িয়ে, পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে প্রায় অর্ধ শতাধিক পুলিশকে। এখানেই শেষ নয় দেখেছি গর্ভবতী এক নারী পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করতে। এ দৃশ্য দেখেছে সারা বিশ্ব। স্বৈরশাসক পালিয়ে বেঁচে গেছে কিন্তু তিনি একবারও ভেবে দেখেননি আমার আদেশের গোলাম নির্দোষ পুলিশরা কিভাবে রেহায় পাবে। মব জাষ্টিসের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে গেছে নিরাপদ স্থানে লাখো পুলিশ। এমন জঘন্য ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটেছে বলে মনে হয় না। এ দেশের পুলিশকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যেন বাংলাদেশ পুলিশ কলুর বলদ। তা নয়তো কি? তার দুটি ঘটনা উল্লেখ করা গেল। আওয়ামী সরকারের পুলিশ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদিনকে এক পুলিশ কর্মকর্তা কিল ঘুষি লাথি মেরে শার্ট ছিড়ে লাঞ্চিত করে। ঠিক তদ্রুপ বিএনপি সরকার এর আমলে প্রেস ক্লাবের সামনে সাবেক মন্ত্রী নাসিমকে পুলিশ লাঠিপেটা করে মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়।

উল্লেখ্য ঘটনা দুটিতে একটি প্রশ্ন এসে যায়, তা হলো পুলিশ যে দ’ুজন ব্যক্তিকে অবমাননা করলেন তা ব্যক্তি স্বার্থে নাকি পারিবারিক কোন দ্বন্দের জেরে? পুলিশ ছিল মূলত: হুকুমের গোলাম। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতে বাধ্য কর্তব্যরত পুলিশ তা না হলে হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশ্ন হচ্ছে এখানে পুলিশ কি আসলেই খারাপ না কি খারাপ হতে বাধ্য করা হয়? রাষ্ট্রের শৃংখলা বজায় রাখতে প্রয়োজনে লাঠি চার্জ, টিয়ার সেল, জল কামান ব্যবহার করতে হয় এবং তার বৈধতা আছে আইনগতভাবে। যা কোন অপরাধ নয়। তবুও শোনা যায় পুলিশ খারাপ। এক কথায় বলা যায় যত দোষ নন্দ ঘোষ্ সব দোষ যেন পুলিশের।

বিজ্ঞাপন

১৮০৮ সাল থেকে ২০২৪ এর ৫ই আগষ্ট পর্যন্ত পুলিশ ছিল কর্র্তপক্ষ বা সরকারের আজ্ঞাবহ। ২২৬ বছর পুলিশ চলেছে সিনা টান করে ২০২৪ এর পর পুলিশ চলছে অপরাধীর মত মহাতঙ্কে। পুলিশ হারিয়ে ফেলেছে তার মনোবল, হারিয়েছে উদ্দিপনা ও কর্মক্ষমতা, পুলিশের কন্ঠ হয়ে গেছে স্তিমিত। নতুন সরকার এলেও কাটেনি আতঙ্ক। একটায় চিন্তা না জানি কোন ঘটনায় আবার ফেঁসে যায়। পুলিশকে চরম নাজুক এবং দুর্বল ভাবছে জনগণ এবং কতিপয় সন্ত্রাসী জনগণ।

বিগত মে মাসে ঢাকাসহ ৯ জেলায় ১৩ স্থানে পুলিশের উপর হামলা হয়েছে। তথায় আহত হয়েছে পুলিশসহ র‌্যাবের ৩২ জন সদস্য। ২০২৬ এর মে পর্যন্ত পুলিশের উপর হামলা হয়েছে ২১৩। সিলেট ও চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন পুলিশ ও র‌্যাবের দুই সদস্য।

২০২৫ সালে পুলিশের উপর হামলা হয় ৬০১ টি। আহত হয় সর্বাধিক ৯৬ জন পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পুলিশ ৮৩৪ টি হামলা প্রতিহত করাসহ মোকবিলা করেছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও পুলিশ পুরোপুরি স্বাধীন নয় এ কথা বলতে দ্বিধা নেই। ২০২৪ এর আন্দোলনে নিহত জনতা হত্যার বিচার চলছে। তবে প্রশ্ন এসে যায় যে, ৪৬ জন পুলিশ হত্যার কি মামলা হয়েছে বা কোন বিচার কাজ কি চলছে?

বলতে দ্বিধা নেই পুলিশ কি আজও হতে পেরেছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ? সরকারি দলের নেতা নেত্রীদের মতামতের উপর চলছে অনেক থানা পুলিশ। অনেক থানায় পুলিশ মামলা নিতেও ভয় পাচ্ছে।

এত কিছু জানার পরও কি বলব পুলিশ স্বেচ্ছাচারি? শান্তি প্রিয় কোটি জনতার প্রশ্ন যে পুলিশ আমাদেরকে নির্ভয়ে শান্তিতে ঘুমাতে সাহায্য করে সেই পুলিশ কি অতি দ্রুত ফিরে পাবে হারানো মনোবল না কি থেকে যাবে বর্তমান অবস্থাতে।

বিজ্ঞাপন

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD