শিশুর শেখার আনন্দ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?

একটি শিশুর হাতে যখন প্রথম বইটি তুলে দেওয়া হয়, তখন আমরা সাধারণত ভাবি সে অক্ষর শিখবে, শব্দ শিখবে, বাক্য পড়তে শিখবে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভেবে দেখেন, সেই মুহূর্তে তার মস্তিষ্কের ভেতরে কী অসাধারণ এক যাত্রা শুরু হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ জন্মগতভাবে পড়তে জানে না। হাঁটতে শেখার জন্য যেমন প্রকৃতি তাকে প্রস্তুত করে দেয়, পড়ার জন্য তেমন কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা মানুষের মস্তিষ্কে নেই।
বিজ্ঞাপন
হাজার হাজার বছরের সভ্যতার পথে মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক মস্তিষ্ক গড়ে তুলেছে, যা অক্ষরের মধ্যে অর্থ খুঁজে পায়, শব্দের মধ্যে কল্পনা খুঁজে পায়, আর বইয়ের পাতায় খুঁজে পায় সম্পূর্ণ নতুন একটি পৃথিবী।
শিশশিক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিস্ময়কর সত্য সামনে আসে—শিক্ষার শুরু বই থেকে নয়, মস্তিষ্ক থেকে। শিশুর শেখার ক্ষমতা, সংখ্যাবোধ, কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক সুস্থতা—সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত শিক্ষা। অথচ আমরা প্রায়ই শিক্ষাকে সংকুচিত করে ফেলি পরীক্ষার নম্বর, রিপোর্ট কার্ড কিংবা ভর্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে।
আজকের পৃথিবীতে অনেক অভিভাবক সন্তানের জন্য সেরা স্কুল, সেরা কোচিং, সেরা বই এবং সেরা প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু একটি প্রশ্ন খুব কমই করা হয়—শিশুটি কি শেখার আনন্দ পাচ্ছে?
বিজ্ঞাপন
গবেষক মেরিয়ান উলফ দেখিয়েছেন, পড়ার ক্ষমতা আসলে মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর অভিযোজন। একটি শিশু যখন ধীরে ধীরে অক্ষর চিনতে শেখে, তখন তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ নতুনভাবে সংযুক্ত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়া কোনো যান্ত্রিক বিষয় নয়; এটি গভীরভাবে মানবিক। তাই পড়া শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় চাপ নয়, আনন্দ। যে শিশু গল্পের বইয়ের পাতায় হারিয়ে যেতে পারে, সে কেবল ভাষা শেখে না; সে সহমর্মিতা শেখে, কল্পনা শেখে, অন্য মানুষের জীবন বুঝতে শেখে। বই তখন তার কাছে পরীক্ষার বিষয় নয়, আবিষ্কারের দরজা হয়ে ওঠে।
একইভাবে গণিতও অনেক সময় আমাদের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়। শিশুরা গণিতকে ভয় পায়—এটি আমরা প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নিয়েছি। অথচ স্নায়ুবিজ্ঞানী স্ট্যানিসলাস ডিহেনের গবেষণা বলছে, সংখ্যাবোধ মানুষের সহজাত ক্ষমতার অংশ। দুই বছরের শিশুও কম-বেশি, বড়-ছোট কিংবা বেশি-কমের পার্থক্য বুঝতে পারে। অর্থাৎ গণিতের বীজ তার মস্তিষ্কে আগে থেকেই রয়েছে। আমাদের কাজ সেই বীজকে বিকশিত করা, ভয় সৃষ্টি করা নয়। যখন সংখ্যা খেলার অংশ হয়, ধাঁধার অংশ হয়, বাস্তব জীবনের গল্পের অংশ হয়, তখন গণিত মুখস্থ করার বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে চিন্তা করার ভাষা।
কিন্তু শিক্ষা শুধু ভাষা ও সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ সমাজে বাস করে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্যে বাস করে, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে। তাই একটি শিশুর প্রকৃত শিক্ষা তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন সে নিজের চারপাশের পৃথিবীকে বুঝতে শেখে। নিজের দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, বিজ্ঞানচর্চা কিংবা বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ধারণা ছাড়া শিক্ষিত হওয়া সম্ভব, কিন্তু আলোকিত হওয়া সম্ভব নয়। শিশুর মস্তিষ্কে যত বেশি অর্থবহ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জ্ঞান জমা হয়, তার চিন্তার জগৎ তত সমৃদ্ধ হয়। সে তখন শুধু তথ্য জানে না; তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেতে শেখে।
বিজ্ঞাপন
তবে জ্ঞান অর্জনের পথেও একটি অদৃশ্য বাধা আছে—ভুল করার ভয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো, আমরা শিশুদের খুব দ্রুত ‘মেধাবী’ কিংবা ‘মেধাহীন’ তকমা দিয়ে দিই। একটি ভালো ফলাফলকে আমরা স্থায়ী বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ মনে করি, আবার একটি ব্যর্থতাকে অযোগ্যতার পরিচয় হিসেবে দেখি। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েক দেখিয়েছেন, মানুষের সক্ষমতা স্থির নয়; অনুশীলন, অধ্যবসায় এবং সঠিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা ক্রমাগত বিকশিত হতে পারে। যে শিশু বিশ্বাস করে ভুল করা শেখার অংশ, সে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। আর যে শিশু বিশ্বাস করে তার মেধা জন্মগত ও অপরিবর্তনীয়, সে ব্যর্থতার ভয়ে নিরাপদ পথ বেছে নেয়। ভবিষ্যৎ গড়ে দেয় প্রথম শিশুটিই।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি শিশুদের মানুষ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি, নাকি কেবল সফল হওয়ার চাপ দিচ্ছি?
আধুনিক পৃথিবীর এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, শিশুরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু একইসঙ্গে বেশি উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং মানসিক চাপে ভুগছে। অনেক পরিবারে শিশুর সময়সূচি এতটাই পরিকল্পিত যে সেখানে অবসর, কৌতূহল কিংবা নিছক আনন্দের জন্য কোনো জায়গায় অবশিষ্ট থাকে না। সাফল্যের দৌড়ে আমরা কখনো কখনো ভুলে যাই, একটি শিশু প্রথমত একজন মানুষ, পরে সে শিক্ষার্থী।
বিজ্ঞাপন
মানসিকভাবে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং সহমর্মী একজন মানুষ তৈরি করতে না পারলে শিক্ষার অন্য সব অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলো—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া, হতাশা মোকাবিলা করা, ব্যর্থতা থেকে উঠে দাঁড়ানো, নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করা—এসব কোনো পরীক্ষার খাতায় মাপা যায় না।
সম্ভবত এ কারণেই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করা নয়; বরং শেখার আনন্দকে ফিরিয়ে আনা। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিশুর কৌতূহল নম্বরের চাপে হারিয়ে যাবে না; যেখানে প্রশ্ন করা ভুলের চেয়ে বেশি মূল্য পাবে; যেখানে বই কেবল পরীক্ষার উপকরণ নয়, কল্পনার জানালা হবে; যেখানে গণিত হবে যুক্তির খেলা; যেখানে ইতিহাস হবে পরিচয়ের উৎস; যেখানে ব্যর্থতা হবে শেখার সোপান; আর যেখানে সফলতার চেয়েও বড় লক্ষ্য হবে একজন সুস্থ, মানবিক ও চিন্তাশীল মানুষ হয়ে ওঠা।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা কোনো প্রতিযোগিতা নয়। শিক্ষা হলো একটি শিশুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হওয়ার গল্প। আর সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলো লেখা হয় তখনই, যখন আমরা তাকে শুধু এগিয়ে যেতে বলি না, বরং শেখার আনন্দটুকুও উপভোগ করতে দিই।
বিজ্ঞাপন
লেখক: মামনুর রশীদ
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
পিরোজপুর সদর








