Logo

ঈদের মিষ্টিমুখে সেমাই : ঐতিহ্য, ঝুঁকি ও সচেতনতার আহ্বান

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১৮ মার্চ, ২০২৬, ২০:৩৬
ঈদের মিষ্টিমুখে সেমাই : ঐতিহ্য, ঝুঁকি ও সচেতনতার আহ্বান
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাস আত্মসংযম, ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সময়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সিয়াম পালন মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও নৈতিক শক্তিতে দৃঢ় করে। এই দীর্ঘ ৩০ দিনের সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর—যার অর্থই আনন্দ, খুশি ও ভাগাভাগি। আর এই আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মিষ্টিমুখ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সবার প্রিয় সেমাই।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ঈদের সকাল যেন সেমাই ছাড়া অসম্পূর্ণ। দুধ-সেমাই, লাচ্ছা সেমাই, শাহী সেমাই—বৈচিত্র্যে ভরা এই মিষ্টান্ন শুধু খাবার নয়; এটি পারিবারিক বন্ধন, অতিথি আপ্যায়ন এবং ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই খাদ্যাভ্যাস আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অপতৎপরতা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি পবিত্র রমজান মাসে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নারায়ণগঞ্জ, নীলফামারী, রংপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুরসহ দেশের অন্যান্য জেলায় ২৯টি সেমাই কারখানায় পরিচালিত অভিযানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন অভিযানে দেখা গেছে—অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে সেমাই উৎপাদন, পায়ে মাড়িয়ে ময়দার ডো তৈরি, অনুমোদনহীন কারখানায় উৎপাদন, এবং অননুমোদিত ও ক্ষতিকর কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক (যেমন হাইড্রোজ, সাল্টু, নন-ফুড গ্রেড রং ইত্যাদি), ডালডা গলানো এবং পোড়া তেলের ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়া লেবেলবিহীন ও খোলা অবস্থায় এবং কম ওজন দিয়ে সেমাই বিক্রয়ও লক্ষ্য করা গেছে। স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ভেজাল মিশ্রিত লাচ্ছা সেমাই উৎপাদনের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভেজাল লাচ্ছা সেমাই জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে আমাদের একজন বিএস (BS) প্রকল্পের শিক্ষার্থী স্বল্প পরিসরে সেমাই উৎপাদন নিয়ে কাজ করেছিল। আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, অনেক উৎপাদক বিএসটিআই (BSTI) থেকে সিএম লাইসেন্স গ্রহণ করেননি, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) ৩৮৪:২০১৭ মানদণ্ড অনুসরণ করছেন না এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদনও নিশ্চিত করছেন না। পরীক্ষিত বিভিন্ন নমুনায় অজানা ও মাত্রাতিরিক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এছাড়া ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক (As), ক্যাডমিয়াম (Cd) এবং সীসা (Pb) বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাপ্ত ফলাফলে শুধুমাত্র সীসা (Pb)-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তবে তা নির্ধারিত সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যেই ছিল।

লাচ্ছা সেমাই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর বাধ্যতামূলক সিএম লাইসেন্সের আওতাভুক্ত একটি খাদ্যপণ্য। এই পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য বিএসটিআই থেকে সিএম লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক এবং প্যাকেটজাত অবস্থায় ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০১৭’ অনুসরণ করে যথাযথ লেবেলসহ বাজারজাত করতে হয়। লাইসেন্স ব্যতীত, লেবেলবিহীন ও খোলা অবস্থায় লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন ও বিক্রয় আইনত দণ্ডনীয়। এ ধরনের কার্যক্রম শুধু আইনবিরোধী নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

খাদ্যে ব্যবহৃত অননুমোদিত রং ও রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল এবং অসংক্রামক রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত খাদ্যে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, যা তাৎক্ষণিক খাদ্যজনিত অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও মোড়কীকরণের কারণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ৩টি প্রতিষ্ঠানের— আল সামি নবাবী ঘি লাচ্ছা সেমাই (প্রস্তুতকারী/প্যাকেটকারী: আল সামি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরি, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ), নিউ গ্রামীণ লাচ্ছা সেমাই (প্রস্তুতকারী/প্যাকেটকারী: এস কে ফুড প্রোডাক্টস, নিতাইগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ) এবং পাও লাচ্ছা সেমাই (প্রস্তুতকারী/প্যাকেটকারী: আমিন স্কয়ার বিডি, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ)— বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশনা জারি করেছে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি সকল খাদ্য ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারীদের এসব পণ্য বিক্রয় না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সর্বসাধারণকে উল্লিখিত পণ্য ক্রয় ও ভক্ষণ থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া সকল খাদ্য ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সবিহীন এবং লেবেলবিহীন খোলা অবস্থায় লাচ্ছা সেমাই বিক্রি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে এবং সর্বসাধারণকে লাইসেন্সবিহীন ও মানহীন খোলা লাচ্ছা সেমাই ক্রয় বা ভক্ষণ থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়।

তবে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়—ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ভোক্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেমাই কেনার সময় কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত—

• প্যাকেটজাত ও লেবেলযুক্ত পণ্য কিনতে হবে

বিজ্ঞাপন

• উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যাচাই করতে হবে

• বিএসটিআই অনুমোদন আছে কিনা নিশ্চিত হতে হবে

• খোলা বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রিত সেমাই পরিহার করতে হবে

বিজ্ঞাপন

• ভেজাল বা অনিরাপদ খাবার দেখলে বিএফএসএ-এর হটলাইন নম্বর ১৬১৫৫ অথবা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানাতে হবে

একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সেমাইজাত খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) ৩৮৪:২০১৭ মান অনুসরণ, বিএফএসএ-এর ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০১৭’ মেনে চলা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ এবং মানসম্মত কাঁচামাল ব্যবহার করা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়—এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা নিরাপদ ও সুস্থ জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই আসুন, আমরা সবাই সচেতন হই—নিরাপদ খাদ্য বেছে নেই, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি।

বিজ্ঞাপন

নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ জীবন—এই হোক আমাদের ঈদের অঙ্গীকার।

লেখক:

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব

বিজ্ঞাপন

সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন)

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD