বাংলাদেশ ত্যাগকারীদের আয়কর রিটার্ন দাখিলে কি রয়েছে নিয়মাবলীতে?

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কর ব্যবস্থা একটি অপরিহার্য ভিত্তি। দেশের ভেতরে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির জন্য যেমন কর নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে যারা বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাদের জন্যও আয়কর আইন ২০২৩-এ বিশেষ নিয়মাবলী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নিয়মগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো, একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি দেশ ত্যাগের আগে তার বাংলাদেশে অবস্থানকালে অর্জিত আয়ের ওপর সঠিকভাবে এবং স্বচ্ছভাবে কর প্রদান নিশ্চিত করা।
বিজ্ঞাপন
আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ১৯৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে কর নির্ধারণের প্রক্রিয়া তার আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পূর্বেই শুরু হয়। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা করের ফাঁকি রোধে সহায়ক। যদি ওই ব্যক্তির পূর্বে কোনো কর নির্ধারণ হয়ে থাকে, তবে তার আয়বর্ষের শেষ দিন থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ত্যাগের সম্ভাব্য তারিখ পর্যন্ত সময়ের জন্য কর নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ, শেষ আয়বর্ষের পরে তার প্রস্থানের সম্ভাব্য তারিখের মধ্যবর্তী সময়কালের জন্য নির্ধারিত কর বলবৎ থাকবে এবং তা ঐ অর্থবছরের হিসাবেই গণ্য হবে। যদি তার পূর্বে কোনো কর নির্ধারণ না হয়ে থাকে, তবে তার স্থায়ীভাবে দেশ ত্যাগের আগে যেই সময়ে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন, সেই সম্পূর্ণ মেয়াদের জন্য তার আয় নির্বিশেষে কর নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে, যে হারে কর নির্ধারণ করা হয়, সেই হারে কর আরোপ করা হবে। পরবর্তীতে, শেষ আয়বর্ষের পর, তার প্রস্থানের সম্ভাব্য তারিখের মধ্যে যে সময়কাল থাকবে, সেই সময়ের জন্য নির্ধারিত কর বলবৎ থাকবে এবং তা ঐ অর্থবছরের হিসাবেই গণ্য হবে। অর্থাৎ, দেশত্যাগকারীকে তার শেষ অবস্থানকালের পুরো আয়ের হিসাব চুড়ান্ত করে তবেই দেশ ছাড়তে হবে।
কর নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে, আইনের বিধান অনুযায়ী উপকর কমিশনার একটি আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেন। উপকর কমিশনার, বাংলাদেশ ত্যাগকারী স্বাভাবিক ব্যক্তিকে একটি নোটিশ জারি করবেন। এই নোটিশে তাকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (যা ৭ দিনের কম হবে না) প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিলাদি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। এই তথ্যগুলির মধ্যে থাকবে ধারা ১৬৬ অনুযায়ী করদাতাকে নির্দিষ্ট ফরমে এবং পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্ন জমা দিতে হবে, যা তার প্রতি আয়বর্ষের মোট আয় সংবলিত হবে এবং প্রতিটি পূর্ণ আয়বর্ষ শেষে, তার বাংলাদেশ ত্যাগের সম্ভাব্য তারিখ পর্যন্ত তার মোট আয়ের প্রাক্কলন (Estimation) জমা দিতে হবে। নোটিশ প্রদানের পদ্ধতিটি আইনের সকল বিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়, যা ধারা ১৭২ অনুযায়ী নোটিশ প্রদানের প্রক্রিয়াতে পূর্ণতা লাভ করে। এই পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে করদাতা তাঁর আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অবগত এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।
তাছাড়া, আয়কর আইনের ধারা ২৮৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে, যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশে আর ফিরে আসবেন না, তাদের জন্য আয়কর কর্তৃপক্ষ তথা উপকর কমিশনারের থেকে একটি কর পরিশোধের সার্টিফিকেট নিতে হয় এবং এই সার্টিফিকেট ছাড়া তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করিতে পারিবেন না। যদি ওই ব্যক্তি ভবিষ্যতে দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে তিনি একটি অব্যাহতি সার্টিফিকেটও পেতে পারেন, যা তাকে এক বা একাধিকবার ভ্রমণের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয়। এই সার্টিফিকেট ছাড়া, বিমানের মালিক বা চার্টারার তাদেরকে বিদেশে যাত্রা করতে অনুমতি দিতে পারবেন না। যদি তারা সার্টিফিকেট ছাড়াই অনুমতি দেন, তবে তাদেরকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং অপরিশোধিত কর পরিশোধ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তবে যারা বিদেশে অবস্থান করেন, অনলাইন আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পূর্বে কর আইনজীবী কিংবা পরিবারেরর সদস্যদের মাধ্যমে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারতেন। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা বিদেশে অবস্থান করেন, তাদের জন্য ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয় কিন্তু তারা চাইলে অনলাইনে ই-রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। ই-রিটার্ন দাখিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতাদের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা চালু করেছেন, যেখানে মোবাইলে নাম্বারের পরিবর্তে ইমেইলে ওটিপি প্রেরন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং যার মাধ্যমে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের জন্য রেজিট্রেশন সম্পন্ন করতে পারেন। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের পাসপোর্ট নাম্বার, জাতীয় পরিচয় পত্র (NID) নাম্বার, ভিসার পৃষ্ঠা বা সীলের কপি, ইমেইল ঠিকানা এবং সাম্প্রতিক একটি ফটোগ্রাপ ইমেইলে উল্লেখ করে ereturn@etaxnbr.gov.bd এই ইমেইলে মেইল করতে হবে। উক্ত মেইল টি যাচাইকরণের পর আবেদনকারীর ইমেইলে একটি ওটিপি এবং রেজিস্ট্রেশন লিংক পাঠানো হবে, সেই লিংক এবং ওটিপি ব্যবহার করে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি করদাতারা সহজেই ই-রিটার্ন সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এবং অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
এই বিশেষ নিয়মাবলী প্রণয়নের মূল কারণ হলো বাংলাদেশে থাকা কর কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দেশত্যাগকারী ব্যক্তিদের জন্য সঠিকভাবে কর নির্ধারণ করা। একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি যখন তার কর্মজীবন বা বসবাসের স্থান পরিবর্তন করে অন্য দেশে চলে যান, তখন তার শেষ অবস্থানকালীন আয়ের ওপর সঠিকভাবে কর প্রদান নিশ্চিত করা বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আয়কর আইন ২০২৩ বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করেছে। এটি নিশ্চিত করে যে, দেশের একজন নাগরিক তার করের দায়িত্ব সম্পন্ন করেই বিশ্বজুড়ে নতুন জীবনের পথে যাত্রা শুরু করছেন এবং যারা বিদেশে অবস্থান করেছেন তারাও সহজে আয়কর পরিশোধ এবং আয়কর রিটার্ন সময়মতো দাখিল করে দেশের অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখছেন।
বিজ্ঞাপন
লেখক: ফয়সাল ইসলাম এফসিএ, এলএলবি








