উন্নয়নের নামে আমরা কি ভবিষ্যৎ ঢাকাকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

ঢাকা শহরকে ঘিরে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু যানজট নয়, শুধু জলাবদ্ধতাও নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — আগামী ২০ বছর পর এই শহর আদৌ বাসযোগ্য থাকবে কি না।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বুকে এখনো যে কয়েকটি জলাধার জীবিত আছে, তার মধ্যে বারিধারা-গুলশান-হাতিরঝিল লেক করিডোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি লেক নয়; এটি ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য, বৃষ্টির পানি ধারণ ক্ষমতা, নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ নগর নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো এই লেক করিডোরকে “সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প” হিসেবেই দেখি। অথচ বাস্তবে এটি একটি জাতীয় নগর কৌশলগত সম্পদ।
আজ গুলশান, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য, ড্রেনেজ পানি ও দূষণ বিভিন্নভাবে লেক ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সমন্বয়হীন উন্নয়নের কারণে পুরো করিডোর ধীরে ধীরে পরিবেশগত চাপের মুখে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনো পর্যন্ত এই পুরো করিডোরের জন্য পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীভূত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা যায়নি।
এই অবস্থায় সামনে মূলত দুইটি পথ রয়েছে।
প্রথমটি হলো পুরনো ধাঁচের ডিসেন্ট্রালাইজড ব্যবস্থা, যেখানে ভবনভিত্তিক সেপটিক ট্যাংক, আলাদা বর্জ্য নিষ্কাশন ও বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চমূল্যের নগর এলাকায় এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। জায়গার সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতা, দুর্গন্ধ, বৃষ্টির সময় উপচে পড়া বর্জ্য, ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ এবং নিয়মিত স্লাজ অপসারণের জটিলতা ভবিষ্যতে আরও বড় নগর সংকট তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় পথটি হলো একটি সমন্বিত কেন্দ্রীভূত আধুনিক ব্যবস্থা, যেখানে পুরো লেক করিডোর ঘিরে আন্ডারগ্রাউন্ড আরসিসি ক্যানেল নেটওয়ার্ক তৈরি করে সব বর্জ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নেওয়া হবে এবং পরিশোধনের পরই পানি পুনরায় লেক ব্যবস্থায় ছাড়া হবে।
এই ধারণার সবচেয়ে যুগান্তকারী অংশ হলো “ফ্লোটিং সোলার” সংযোজন, যেখানে লেকের সীমিত অংশ ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমার জানা মতে, কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও এই লেক করিডোর উন্নয়ন নিয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।
বিজ্ঞাপন
যদি আবারও পুরনো ধাঁচের নকশা, খণ্ডিত পরিকল্পনা এবং শুধুমাত্র দৃশ্যমান উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শহর নতুন করে আরও বড় পরিবেশগত ও ড্রেনেজ সংকটে পড়তে পারে।
কারণ আধুনিক নগর পরিকল্পনা শুধু রাস্তা, লাইটিং বা ওয়াকওয়ে নির্মাণের নাম নয়। এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেখানে হাইড্রোলজি, ওয়েস্টওয়াটার মডেলিং, ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স, আরবান হিট আইল্যান্ড, জলাধার সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ — সবকিছু একসাথে বিবেচনা করতে হয়।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, যদি যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি, এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, হাইড্রোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস এবং সমন্বিত আরবান প্ল্যানিং ছাড়া এত গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে পুরো প্রকল্পের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এমনকি এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “স্মার্ট ও টেকসই বাংলাদেশ” গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলিত বাস্তবতা হলো কোরবানির ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
প্রতিবছর ঈদের সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ পশুর রক্ত, চর্বি, বর্জ্য ও জৈব আবর্জনা ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত এই লেক করিডোরেই এসে পড়ে। কয়েকদিনের জন্য পুরো পরিবেশের উপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। পানির রঙ পরিবর্তন হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পূর্ণাঙ্গ এলাকা-ভিত্তিক আধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিশ্বের অনেক মুসলিম প্রধান দেশ এখন কোরবানির জন্য নির্ধারিত জোন, আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব ডিসপোজাল সিস্টেম এবং অস্থায়ী ট্রিটমেন্ট ইউনিট ব্যবহার করছে। অথচ আমরা এখনো মূলত “ঈদের পর পরিষ্কার অভিযান”-নির্ভর ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি শহর কি শুধু সংকটের পরে পরিষ্কার করলেই আধুনিক হয়ে যায়?
বিজ্ঞাপন
নাকি আধুনিক শহর সেই শহর, যে আগে থেকেই ভবিষ্যৎ সংকটের জন্য পরিকল্পনা করে?
আজকের বিশ্বে উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলে গেছে।
এখন উন্নয়ন মানে শুধু কংক্রিট নয়; উন্নয়ন মানে পরিবেশ রক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ নগর নিরাপত্তাকে একসাথে নিশ্চিত করা।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের বড় শহরগুলো এখন তাদের লেক ও জলপথকে ঘিরে নতুন অর্থনীতি তৈরি করছে। সিঙ্গাপুর, সিউল, দুবাই কিংবা সাংহাই জলাধারকে শুধুমাত্র সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে দেখেনি; তারা এটিকে ভবিষ্যৎ নগর সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশও চাইলে পারে।
বারিধারা-গুলশান-হাতিরঝিল লেক করিডোর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম বাস্তব “স্মার্ট গ্রিন আরবান করিডোর”।
বিজ্ঞাপন
যেখানে থাকবে:
• কেন্দ্রীভূত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
• পরিচ্ছন্ন পানি প্রবাহ
বিজ্ঞাপন
• ফ্লোটিং সোলার
• আধুনিক ওয়াকওয়ে
• পরিবেশবান্ধব পাবলিক স্পেস
• আন্ডারগ্রাউন্ড ইউটিলিটি
• জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো
এখন প্রশ্ন একটাই — আমরা কি আবারও পুরনো চিন্তাধারার কাছে ফিরে যাব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যিকারের আধুনিক ঢাকা গড়ার সাহস দেখাব?
কারণ একটি শহর তখনই আধুনিক হয়, যখন সে তার পানি, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে শেখে।
এম. এ. পারভেজ চৌধুরী
সিইও - পাওয়ার এশিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড








