Logo

শিশুর শ্রেণিকক্ষ, জাতির ভবিষ্যৎ

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১ জুন, ২০২৬, ১৬:২০
শিশুর শ্রেণিকক্ষ, জাতির ভবিষ্যৎ
ফাইল ছবি।

শিশুকে কী শেখানো উচিত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আধুনিক বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছে। একদিকে পরীক্ষার চাপ কমানোর দাবি, অন্যদিকে শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্বেগ। কোথাও শিশুদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার প্রতিযোগিতার চাপে শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কখনো বলা হচ্ছে জ্ঞানের চেয়ে দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আবার কখনো আবেগীয় সুস্থতাকে এমনভাবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ফলে অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতিদীর্ঘারকদের সামনে প্রশ্নটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—আসলে একটি শিশুর শিক্ষার ভিত্তি কী হওয়া উচিত?

​এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আধুনিক শিক্ষাচিন্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই আমাদের সামনে একটি বিস্ময়কর সত্য তুলে ধরে। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা প্রায় সবাই এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে—শিক্ষা কেবল শিশুকে সুখী রাখার প্রকল্প নয়, আবার কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার ব্যবস্থাও নয়। শিক্ষা হলো শিশুকে পৃথিবীকে জানার, বোঝার এবং ভবিষ্যতে তাকে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত করার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

​গত কয়েক দশকে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, শিশুকে তথ্য ও জ্ঞানের চেয়ে শেখার কৌশল শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনেক দেশে পাঠ্যসূচি থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা সভ্যতার মৌলিক জ্ঞানের গভীরতা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে। কোনো শিশু যদি পৃথিবী সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানই না পায়, তাহলে সে চিন্তা করবে কী দিয়ে? সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা কিংবা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা—সবকিছুর ভিত্তিতেই তো জ্ঞান প্রয়োজন। একটি শিশুর মস্তিষ্ক খালি ক্যানভাস নয়; তাকে সমৃদ্ধ করতে হয় তথ্য, ধারণা, ইতিহাস, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আলো দিয়ে। যে শিশু জানে না, সে কল্পনাও করতে পারে না। তাই শিক্ষার প্রথম দায়িত্ব শিশুকে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

​তবে জ্ঞান অর্জনের এই প্রক্রিয়ায় আরেকটি বিপদও তৈরি হয়েছে। আধুনিক সমাজে শিশুদের অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা খুব ভঙ্গুর, খুব অসহায়। ফলে জীবনের সামান্য ব্যর্থতা, প্রতিযোগিতা কিংবা কঠিন বাস্তবতা থেকেও তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মানুষ কি এভাবে শক্ত হয়ে ওঠে? একটি গাছকে যদি কখনো বাতাসের মুখোমুখি হতে না দেওয়া হয়, তাহলে তার শিকড়ও শক্ত হয় না। শিশুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাকে ভালোবাসতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে, কিন্তু একইসঙ্গে শেখাতে হবে যে জীবনে ব্যর্থতা আছে, প্রত্যাখ্যান আছে, সংগ্রাম আছে। শিক্ষা যদি শিশুকে কেবল সুরক্ষার আবরণে মুড়ে রাখে, তাহলে বাস্তব পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার সাহস সে কোথা থেকে পাবে?

​এই জায়গাতেই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সংকট সামনে আসে—নিত্যনতুন সংস্কারের মোহ। প্রায় প্রতি দশকেই কোনো না কোনো নতুন শিক্ষাতত্ত্ব আসে, যা দাবি করে যে এবার শিক্ষার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, নতুন শিক্ষাদর্শ—সবকিছু নিয়ে শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শিক্ষার জগতে সব নতুন ধারণা সমানভাবে কার্যকর হয় না। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা কোনো পরীক্ষাগার নয়, আর শিশুরা কোনো গবেষণার উপকরণ নয়। শিক্ষা সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, ধীরস্থির এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবনে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু বছর ধরে বহন করতে হয়।

​একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা মানে নিয়ন্ত্রণ নয়, আবার লাগামহীন স্বাধীনতাও নয়। শিশুকে স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখাতে হবে, প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে, নিজের মত প্রকাশের সাহস দিতে হবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষাও সমান জরুরি। নদী যেমন দুই তীরের কারণে সঠিক পথে প্রবাহিত হয়, তেমনি শিশুর বিকাশও ঘটে স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে। একজন দক্ষ শিক্ষক কিংবা সচেতন অভিভাবক কখনো প্রভুর ভূমিকা পালন করেন না; আবার নিছক দর্শকও হয়ে থাকেন না। তিনি পথ দেখান, কিন্তু পথ চলার আনন্দটুকু শিশুর জন্য উন্মুক্ত রাখেন।

বিজ্ঞাপন

​সবশেষে প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়—আমরা শিশুদের জন্য শিক্ষা কেন চাই? শুধু একটি ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য? শুধু সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য? নাকি আরও বড় কোনো উদ্দেশ্যে?

​শিক্ষা আসলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবসভ্যতার উত্তরাধিকার হস্তান্তরের একটি মহৎ প্রক্রিয়া। আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে শুধু বই তুলে দিই না; তুলে দিই ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং মানবজাতির দীর্ঘ অভিযানের গল্প। একটি শিশু যখন প্রথম কোনো কবিতা পড়ে, যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার কথা জানতে পারে, যখন বিজ্ঞানের কোনো সূত্রের সৌন্দর্য আবিষ্কার করে, তখন সে কেবল তথ্য অর্জন করে না; সে মানবসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়।

​এই কারণেই শিক্ষা মূলত ভবিষ্যতের প্রতি আস্থার আরেক নাম। আমরা শিশুদের পৃথিবীকে যেমন আছে তেমনভাবে বুঝতে শেখাই, যাতে তারা একদিন তাকে আরও ভালো করে গড়ে তুলতে পারে। তাদের হাতে আমরা শুধু পাঠ্যবই তুলে দিই না; তুলে দিই আগামী দিনের দায়িত্বও।

বিজ্ঞাপন

​আজ যখন শিক্ষাকে ঘিরে নানা বিতর্ক, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নানা মতাদর্শিক টানাপোড়েন চলছে, তখন হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সহজ সত্য মনে রাখা—শিশুরা ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা আজকের পৃথিবীরও অংশ। তাদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা তাদের জ্ঞানী করবে, সহনশীল করবে, দৃঢ় করবে এবং মানবিক করবে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার শিশুদের পাঠ্যবইয়ে নয়, তাদের চিন্তাশক্তি, চরিত্র এবং কল্পনাশক্তি ভেতরই লেখা থাকে।

লেখক: মামনুর রশীদ

উপজেলা নির্বাহী অফিসার

বিজ্ঞাপন

পিরোজপুর সদর

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD