Logo

চট্টগ্রামে ব্যাংকের ভল্ট থেকে উধাও ৪ কোটি টাকা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৩১
চট্টগ্রামে ব্যাংকের ভল্ট থেকে উধাও ৪ কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের লালদীঘি জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখার ক্যাশ ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ বিভিন্ন গ্রাহকের আমানতের বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় করা মামলায় ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন এবং ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন এমন মো. জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে ব্যাংকিং খাত ও স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে এত বড় অঙ্কের অর্থের ঘাটতি কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকের নিয়মিত হিসাব-নিকাশ ও তদারকিতে ধরা পড়ল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কোতোয়ালি থানায় করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব এবং ভল্টে সংরক্ষিত অর্থের হিসাব মিলিয়ে দেখার সময় গরমিল ধরা পড়ে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে ভল্টের হিসাব, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র, নথি এবং অন্যান্য হিসাব যাচাই করা হয়। এসব যাচাইয়ের পর মোট ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঘাটতি পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকের অভিযোগ, ভল্ট ও ক্যাশের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র অফিসার এবং ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, কামরুল হোসেন মো. জাফরুল্লাহ তানভীরসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের সহায়তায় ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

তবে দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের পরিবার ব্যাংকের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তার বাবা আজিম উল্লাহ দাবি করেছেন, তার ছেলে অগ্রণী ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। এমনকি তিনি ওই শাখার গ্রাহকও নন। তার ছেলে আগে থেকেই গরুর খামারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

তার ভাষ্য, জাফরুল্লাহর কাছে ব্যাংকের বিপুল অর্থ দেওয়ার কোনো ব্যাংক রেকর্ড বা প্রমাণ তাদের দেখানো হয়নি। তারপরও তাকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় আসামি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আজিম উল্লাহ জানান, ৯ আগস্ট রাত ১টার দিকে তার স্ত্রীর মোবাইল ফোনে ব্যাংক থেকে কল করা হয়। তখন বলা হয়, তার ছেলে লালদীঘি ব্যাংকে আটক আছেন এবং টাকা নিয়ে যেতে হবে।

তবে কীসের টাকা বা কত টাকা— সে বিষয়ে তাদের কাছে পরিষ্কার কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার ছেলেকেও ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন আজিম উল্লাহ।

তিনি বলেন, এর আগে ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন অন্যদিনের মতোই তার ছেলেকে ফোন করে ব্যাংকে ডেকে নিয়ে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকে গেলে তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে তারা কোতোয়ালি থানায় বিষয়টি জানান। পুলিশের সহায়তায় রাত আনুমানিক ২টার দিকে ব্যাংকে গেলে পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করে কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে থানায় নিয়ে যায় বলে জানান তিনি।

ঘটনাটি সামনে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার মতো বিপুল অঙ্কের ঘাটতি যদি ভল্ট থেকে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তা এতদিন ধরে ব্যাংকের নিয়মিত হিসাব ও তদারকিতে ধরা পড়ল না কেন।

জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা দাবি করেন, ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৯ আগস্টের মধ্যে যদি এ ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে নিয়মিত ক্যাশ ও ভল্টের হিসাব মেলানোর সময় বিষয়টি আগেই শনাক্ত হওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন

ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন শেষে নগদ অর্থ ও ভল্টের হিসাব মিলিয়ে দেখার নিয়ম থাকার পরও এত বড় অঙ্কের অর্থের ঘাটতি দীর্ঘ সময় অজানা থাকার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনাটি নিয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার নম্বর ২২/৪৩৮। এতে দণ্ডবিধির ৪০৮, ৪২০ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার বাদী অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ। মামলায় কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, গ্রাহকদের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ও তথ্যের রেকর্ডসহ ৬৪ জিবির একটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। তদন্তের মাধ্যমে অর্থের ঘাটতির প্রকৃত কারণ, অর্থ কোথায় গেছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত— এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ব্যাংকের ভল্টে বিপুল অর্থের ঘাটতির ঘটনায় গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং অর্থের গতিপথ স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD