ছয় বছর বয়সে শুরু, ৮২ বছর ধরে কবর খুঁড়ছেন টুলু চাচা

ছয় বছর বয়সে হাতে উঠেছিল কোদাল। সেই শুরু, এরপর কেটে গেছে ৮২ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে গাইবান্ধা শহরের অসংখ্য মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে যুক্ত থেকেছেন আবদুস সোবহান টুলু। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘টুলু চাচা’ নামে। এ পর্যন্ত ১৫ হাজারেরও বেশি কবর খোঁড়ার দাবি তার।
বিজ্ঞাপন
১৯৪৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর জন্ম টুলু মিয়ার। মাত্র ছয় বছর বয়সে, ১৯৫০ সালে বড় ভাই ও স্থানীয়দের সঙ্গে পৌর গোরস্তানে গিয়ে প্রথম কবর খোঁড়ার অভিজ্ঞতা হয় তার। এরপর ধীরে ধীরে নিয়মিতভাবে কবর খোঁড়া ও দাফনের কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন।
পৌরসভায় গোরখোদক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে দীর্ঘদিন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করেছেন তিনি। ১৯৮৯ সালে পৌরসভায় অস্থায়ী গোরখোদক হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময় তার মাসিক বেতন ছিল পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমানে বেতন পান নয় হাজার টাকা।
দিন-রাতের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই তার কাজের। শহরের কোথাও মৃত্যুর খবর পৌঁছালেই ডাক পড়ে টুলু মিয়ার। পরিবারের সদস্যরা যখন স্বজন হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন, তখন নীরবে কবর খুঁড়ে দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে টুলু মিয়া জানান, অনেক সময় ভোর হওয়ার আগেই কিংবা গভীর রাতে তাকে কবরস্থানে যেতে হয়েছে। নির্জন জায়গায় কাজ করার সময় নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কখনও ভোর হওয়ার আগেই ছুটতে হয়েছে। কখনও গভীর রাতে। নির্জন কবরস্থানে কাজ করতে গিয়ে হয়েছে নানা অভিজ্ঞতা। দেখেছি ক্ষত-বিক্ষত লাশ। কবর থেকে আগুন বের হতেও দেখেছি। জিন দেখার গল্পও শুনেছি। তবে এসবের কোনো প্রমাণ পাইনি।’
দীর্ঘদিন অল্প বেতনে কাজ করেও কোনো আক্ষেপ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে টুলু মিয়া বলেন, তার তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। মানুষের শেষ বিদায়ের কাজে থাকতে পারাকে তিনি সৌভাগ্য হিসেবে দেখেন।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষায়, ‘আল্লাহকে খুশি রাখতে পারাটাই আমার একমাত্র আরাধনা। অভাব ছিল, এখনও আছে। কিন্তু কাজ কখনও ছাড়িনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজটি করে যেতে চাই।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে শাহিনুর বেগম চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয় টুলু মিয়ার। আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি তার। ১৯৬০ সালে জেলা শহরের পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
তাদের সংসারে সাত মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। বর্তমানে চার মেয়ে জীবিত রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
স্বামীর দীর্ঘদিনের এই কাজকে এখন গর্বের চোখেই দেখেন স্ত্রী শাহিনুর বেগম। তবে বিয়ের শুরুর দিকে বিষয়টি তার কাছে সহজ ছিল না।
তিনি বলেন, ‘মাঝরাতে কারও মৃত্যুর খবর এলেই ঘুম থেকে উঠে চলে যেতেন। এমনও হয়েছে, ভাত খেতে বসেছি— হঠাৎ ডাক এসেছে। ভাত রেখেই চলে গেছেন। প্রথম দিকে খুব বিরক্ত লাগত। পরে বুঝেছি, এটা শুধু তার কাজ নয়, দায়িত্ব।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, কবর খোঁড়ার পাশাপাশি অনেক সময় টুলু মিয়া নিজের উদ্যোগে কাফনের কাপড়, বাঁশসহ দাফনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে দেন। কোনো পরিবার বিপদে পড়লে শেষ বিদায়ের আয়োজন সম্পন্ন করতেও সহযোগিতা করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
৫৫ বছর বয়সী রেজাউন্নবী রাজু বলেন, ‘আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই টুলু এই কাজ করেন। তার মতো মানুষ সমাজের গর্ব।’
মুনশিপাড়ার বাসিন্দা জাভেদ হোসেন জানান, এলাকায় কেউ মারা গেলে মসজিদে ঘোষণা দেওয়ার পরই টুলু মিয়াকে খবর দেওয়া হয়। কবর খোঁড়ার পাশাপাশি কাফনের কাপড়, বাঁশসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহেও তিনি সহযোগিতা করেন।
তার ভাষায়, এমন নির্লোভ মানুষ এখন খুব কমই দেখা যায়।








